আক্কেলদাঁত ফেলে দিলে কি ক্ষতি হয়?

প্রয়োজন, উপকারিতা ও ঝুঁকি নিয়ে দাঁত চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা

আক্কেলদাঁত—যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় থার্ড মোলার বলা হয়—মানুষের মুখে ওঠা শেষ দাঁত। সাধারণত ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে মাড়ির একেবারে পেছনের অংশে এই দাঁত ওঠে। কারও ক্ষেত্রে এটি নির্বিঘ্নে ওঠে, আবার অনেকের জন্য এই দাঁত হয়ে ওঠে তীব্র ব্যথা, সংক্রমণ ও দুশ্চিন্তার কারণ।

আক্কেলদাঁতে সমস্যা দেখা দিলে ডেন্টিস্টরা প্রায়ই এটি তুলে ফেলার পরামর্শ দেন। কিন্তু এখানেই তৈরি হয় দ্বিধা—আক্কেলদাঁত তুলে ফেললে ভবিষ্যতে কোনো ক্ষতি হবে কি না? মুখের গঠন বা অন্য দাঁতের ওপর এর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে কি? এই প্রতিবেদনে আক্কেলদাঁত তোলার প্রয়োজনীয়তা, না তুললে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে এবং অপসারণের পর সম্ভাব্য ঝুঁকি ও উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


আক্কেলদাঁত কেন সমস্যা তৈরি করে?

বর্তমান সময়ে মানুষের চোয়ালের গঠন আগের তুলনায় কিছুটা ছোট হয়ে এসেছে। ফলে অনেকের মুখে আক্কেলদাঁত ওঠার মতো পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। এর ফলেই শুরু হয় নানা জটিলতা।

১. আংশিক ওঠা বা ইমপ্যাক্টেড আক্কেলদাঁত

অনেক ক্ষেত্রে আক্কেলদাঁত পুরোপুরি বেরোতে পারে না। মাড়ির ভেতরে বা পাশের দাঁতের সঙ্গে আটকে যায়। এ অবস্থাকে বলা হয় ইমপ্যাক্টেড উইজডম টিথ। এটি আক্কেলদাঁতের ব্যথার সবচেয়ে সাধারণ কারণ।

২. সংক্রমণ ও প্রদাহ

আংশিক ওঠা দাঁতের চারপাশে খাদ্যকণা জমে সহজেই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হয়। এতে মাড়ি ফুলে যায়, ব্যথা বাড়ে এবং অনেক সময় মুখ খুলতেও কষ্ট হয়।

৩. অন্য দাঁতের ওপর চাপ

আক্কেলদাঁত যদি সামনের দাঁতের দিকে চাপ দিতে থাকে, তাহলে দাঁতের সারিবদ্ধতা নষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা আগে দাঁত সোজা করার চিকিৎসা (ব্রেস) নিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এটি বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।


আক্কেলদাঁত ফেলে দিলে কি সত্যিই কোনো ক্ষতি হয়?

ডেন্টাল সার্জারি ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, সঠিক পদ্ধতিতে এবং অভিজ্ঞ ডেন্টাল সার্জনের মাধ্যমে আক্কেলদাঁত তুলে ফেললে সাধারণত কোনো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি মুখ ও মাড়ির সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

আক্কেলদাঁত মানুষের চিবানোর প্রক্রিয়ায় অপরিহার্য নয়। তাই এটি তুলে ফেললেও খাওয়া-দাওয়া বা মুখের স্বাভাবিক কার্যক্রমে কোনো স্থায়ী সমস্যা দেখা দেয় না।


আক্কেলদাঁত তোলার উপকারিতা

১. ব্যথা ও সংক্রমণ থেকে স্থায়ী মুক্তি

আক্কেলদাঁত তুলে ফেললে বারবার হওয়া ব্যথা, মাড়ির ফোলা এবং সংক্রমণের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়। দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার প্রয়োজনও কমে যায়।

২. দাঁতের সারিবদ্ধতা রক্ষা

আক্কেলদাঁত সামনের দাঁতে চাপ দেওয়া বন্ধ করে। ফলে দাঁত বেঁকে যাওয়া বা একটির ওপর আরেকটি উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে।

৩. ওরাল হাইজিন বজায় রাখা সহজ হয়

মুখের একেবারে পেছনে থাকার কারণে আক্কেলদাঁত পরিষ্কার করা কঠিন। দাঁত তুলে ফেললে দাঁত ব্রাশ ও ফ্লস করা সহজ হয়, ফলে ক্যাভিটি ও মাড়ির রোগের ঝুঁকিও কমে।


আক্কেলদাঁত তোলার সম্ভাব্য ঝুঁকি

যেকোনো অস্ত্রোপচারের মতো আক্কেলদাঁত তোলার পরেও কিছু সাময়িক জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে সেগুলোর বেশিরভাগই সময়ের সঙ্গে সেরে যায়।

১. শুষ্ক গর্ত (Dry Socket)

এটি সবচেয়ে পরিচিত জটিলতা। দাঁত তোলার পর যে রক্তের ডেলা তৈরি হয়, তা সরে গেলে হাড় উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং তীব্র ব্যথা শুরু হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যত্ন নিলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

২. ফোলা ও রক্তপাত

অপারেশনের পর কয়েক দিন মুখ ফোলা বা হালকা রক্তপাত হতে পারে। বরফ সেঁক ও নির্ধারিত ওষুধে সাধারণত এটি সেরে যায়।

৩. সংলগ্ন স্নায়ুর সাময়িক ক্ষতি

খুব বিরল ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী স্নায়ু সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে ঠোঁট, জিভ বা চিবুক কিছু সময়ের জন্য অসাড় লাগতে পারে, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অস্থায়ী।


কখন আক্কেলদাঁত না তুললেও চলে?

সব আক্কেলদাঁতই যে তুলতে হবে, এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে ডেন্টিস্টরা আক্কেলদাঁত না তোলার পরামর্শ দেন, যদি—

  • দাঁতটি পুরোপুরি সোজাভাবে ওঠে

  • কোনো ব্যথা বা সংক্রমণ না থাকে

  • পরিষ্কার করা সহজ হয়

  • পাশের দাঁতে চাপ না দেয়

এই ধরনের আক্কেলদাঁত নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণে রাখাই যথেষ্ট।


সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কী করবেন?

আক্কেলদাঁত তুলবেন কি তুলবেন না—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই—

  • এক্স-রে বা ডেন্টাল স্ক্যান করানো

  • অভিজ্ঞ ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শ নেওয়া

  • নিজের উপসর্গ ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনা করা

খুব জরুরি।

নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে দাঁত ফেলে রাখা বা দেরি করা অনেক সময় বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।


উপসংহার

আক্কেলদাঁত তুলে ফেলা একটি পরিচিত ও রুটিন ডেন্টাল পদ্ধতি। সঠিক সময়ে এবং সঠিক চিকিৎসকের মাধ্যমে এটি করলে দাঁত বা মুখের কোনো অপরিহার্য ক্ষতি হয় না। বরং ইমপ্যাক্টেড বা সংক্রমণযুক্ত আক্কেলদাঁত রেখে দিলে তা পাশের সুস্থ দাঁত ও মাড়ির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

তাই আক্কেলদাঁতে বারবার ব্যথা, ফোলা বা সংক্রমণ দেখা দিলে ভয় না পেয়ে বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

Photo: News desk Photo Fill