রূপে-গুণে অনন্য এক জনপ্রিয় ফল
বিদেশি ফল হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে সারা বছরই ভালো মানের কমলা পাওয়া যায়। একসময় শীতকালীন ফল হিসেবেই পরিচিত থাকলেও এখন আধুনিক সংরক্ষণ ও আমদানির কারণে কমলা আর মৌসুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। টসটসে রসে ভরা, টকমিষ্টি স্বাদের এই ফল যেমন খেতে সুস্বাদু, তেমনি এর উজ্জ্বল কমলা রঙ চোখেও দারুণ আরাম দেয়। আশপাশে কমলা রঙের সামান্য ছোঁয়াও মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে যথেষ্ট।
তবে কমলার আসল পরিচয় শুধু এর রং বা স্বাদে সীমাবদ্ধ নয়। পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতার দিক থেকে কমলা একটি অসাধারণ ফল। পুষ্টিবিদদের মতে, নিয়মিত কমলা খেলে শরীর সুস্থ থাকে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং নানা জটিল রোগের ঝুঁকিও কমে। আজকের এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো জনপ্রিয় এই ফলটির পুষ্টিগুণ ও নানাবিধ উপকারিতা।
কমলার পুষ্টিগুণ
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, একটি মাঝারি আকারের কমলায় গড়ে প্রায় ৬২ ক্যালরি শক্তি থাকে। ক্যালরির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও এতে রয়েছে বিপুল পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ও খনিজ উপাদান।
একটি কমলায় প্রায়—
-
ভিটামিন সি: ৯৩ শতাংশ
-
খাদ্য আঁশ (ফাইবার): ১১ শতাংশ
-
ফোলেট: ১০ শতাংশ
-
ভিটামিন বি১ (থায়ামিন): ৯ শতাংশ
-
কপার: ৭ শতাংশ
-
পটাশিয়াম: ৫ শতাংশ
-
ক্যালসিয়াম: ৫ শতাংশ
এছাড়া কমলার প্রায় ৮৭ শতাংশই পানি। শীতকালে বা ঠান্ডা আবহাওয়ায় অনেকেই পর্যাপ্ত পানি পান করতে আগ্রহী হন না। সে ক্ষেত্রে কমলা শরীরের পানির ঘাটতি পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
কমলায় থাকা প্রচুর আঁশ হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখে, বাওয়েল মুভমেন্ট ভালো করে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে। ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর
কমলার সবচেয়ে পরিচিত গুণ হলো এতে থাকা ভিটামিন সি। এই ভিটামিন শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভিটামিন সি শরীরের ক্ষতিকর জীবাণু ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে এবং শ্বেত রক্তকণিকার কার্যক্ষমতা বাড়ায়।
নিয়মিত কমলা খেলে শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত কোষ দ্রুত পুনর্গঠিত হয় এবং সাধারণ সংক্রমণ বা অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
প্রদাহ কমাতে সহায়ক
রক্তে থাকা ক্ষতিকর ও প্রদাহজনক উপাদান শরীরের নানা সমস্যার জন্য দায়ী। কমলায় থাকা ভিটামিন সি ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এসব ক্ষতিকর উপাদানের বিরুদ্ধে কাজ করে।
সাইট্রাস জাতীয় ফল হিসেবে কমলা প্রদাহ কমাতে বিশেষভাবে কার্যকর। নিয়মিত কমলা গ্রহণ করলে শরীরের ভেতরের প্রদাহজনিত সমস্যা কমে এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকিও হ্রাস পায়।
ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখে
ত্বকের যত্নে কমলার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমলায় রয়েছে নারিজেনিন নামের একটি বায়োঅ্যাক্টিভ উপাদান, যা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি হিসেবে কাজ করে।
এই উপাদান শরীরের ফ্রি র্যাডিক্যাল নিষ্ক্রিয় করতে সাহায্য করে, ফলে ত্বক পরিষ্কার থাকে এবং বয়সের ছাপ সহজে পড়ে না। ত্বক ভেতর থেকে উজ্জ্বল হয় এবং স্বাভাবিক তারুণ্য দীর্ঘদিন বজায় থাকে।
বিশেষ করে একটু বেশি বয়সী নারীদের জন্য কমলা ত্বকের যত্নে অত্যন্ত উপকারী একটি ফল।
ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে
কমলায় থাকা ভিটামিন সি ত্বককে নমনীয়, কোমল ও উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে। এই কারণেই অনেক প্রসাধনী ও স্কিন কেয়ার পণ্য তৈরিতে কমলার নির্যাস ব্যবহার করা হয়।
নিয়মিত কমলা খেলে ত্বকের শুষ্কতা কমে, ত্বক মসৃণ থাকে এবং স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ফিরে আসে।
ওজন কমাতে সহায়ক
কমলাকে অনেক সময় ক্যালরি কম বা প্রায় ক্যালরিমুক্ত ফল হিসেবে ধরা হয়। এতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার, যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে এবং অপ্রয়োজনীয় খাবার গ্রহণের প্রবণতা কমায়।
এছাড়া কমলায় থাকা থায়ামিন, নিয়াসিন, ভিটামিন বি৬, ম্যাগনেশিয়াম ও কপারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া উন্নত করে। ফলে শরীরের বাড়তি মেদ কমাতে কমলা কার্যকর ভূমিকা রাখে।
ওষুধ শোষণে সহায়তা করে
কমলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য গুণ হলো—এটি শরীরে ওষুধ গ্রহণে সহায়তা করে। কমলার রস শরীরের বায়োকেমিক্যাল ও সাইকোলজিক্যাল প্রভাবের মাধ্যমে ওষুধের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।
ফলে অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত আরোগ্য লাভ সম্ভব হয়। তবে এ বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি।
দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে
চোখের সুস্থতার জন্য ভিটামিন এ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কমলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভিটামিন এ রয়েছে, যা দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং চোখের নানা সমস্যা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।
হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর
কমলায় থাকা পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়ামের মতো খনিজ উপাদান হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই উপাদানগুলো শরীরে সোডিয়ামের প্রভাব কমিয়ে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
কমলা চর্বিহীন, সোডিয়ামমুক্ত ও কোলেস্টেরলমুক্ত হওয়ায় এটি হৃদপিণ্ডের জন্য অত্যন্ত উপকারী ফল হিসেবে বিবেচিত।
ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক
কমলায় থাকা আলফা ও বেটা ক্যারোটিন, ফ্ল্যাভনয়েড ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগ শরীরকে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ক্ষতিকর উপাদান থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
বিশেষ করে ফ্ল্যাভনয়েড উপাদান ফুসফুস ও মুখগহ্বরের ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা
কমলার খোসায় প্রায় কোনো চিনি নেই বললেই চলে এবং ফলের ভেতরের প্রাকৃতিক শর্করাও ধীরে শরীরে শোষিত হয়। ফলে এটি রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়ায় না।
ডায়াবেটিস ও মেটাবলিক সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য পরিমিত পরিমাণে কমলা একটি উপকারী ফল হিসেবে বিবেচিত।
উপসংহার
রূপ, স্বাদ ও গুণ—সব দিক থেকেই কমলা একটি পরিপূর্ণ ফল। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় কমলা রাখলে শরীর সুস্থ থাকে, ত্বক উজ্জ্বল হয়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং নানা জটিল রোগের ঝুঁকি কমে।
সহজলভ্য, সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফলটি প্রতিদিনের খাবারে যুক্ত করাই হতে পারে সুস্থ জীবনের এক সহজ পদক্ষেপ।