‘ট্রাম্প গোল্ড ভিসা’ চালু করল যুক্তরাষ্ট্র

ধনী বিদেশিদের জন্য স্থায়ী বসবাস ও নাগরিকত্বের নতুন পথ

যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসে আগ্রহী বিশ্বের ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য নতুন এক ভিসা কর্মসূচি চালু করেছে দেশটির প্রশাসন। ‘ট্রাম্প গোল্ড ভিসা’ নামে পরিচিত এই বিশেষ ভিসা উদ্যোগের ঘোষণা দেন সাবেক ও বর্তমান প্রভাবশালী রাজনীতিক ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রথমবারের মতো এই ভিসা কর্মসূচির কথা প্রকাশ করেন তিনি। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গেও আলাপে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ভিসা কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত উচ্চমূল্যের বিনিয়োগকারী ও ধনী বিদেশিদের আকৃষ্ট করতে চাইছে, যারা দেশটির অর্থনীতি, করব্যবস্থা এবং কর্পোরেট খাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবেন।


ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা

ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প লেখেন,
“যোগ্য ও যাচাইকৃত আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য দারুণ খবর! ট্রাম্প গোল্ড ভিসা এখন চালু। এটি মার্কিন নাগরিকত্ব অর্জনের একটি সরাসরি পথ হিসেবে কাজ করবে। আমাদের মহান মার্কিন কোম্পানিগুলো তাদের মেধাবী কর্মীদের ধরে রাখতে পারবে।”

এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, ভিসাটিকে শুধু বসবাসের অনুমতি হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে নাগরিকত্বের সম্ভাবনাসহ একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।


কী এই ‘ট্রাম্প গোল্ড ভিসা’?

মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প গোল্ড ভিসা একটি বিশেষ ধরনের স্থায়ী বসবাস অনুমতিপত্র, যার মর্যাদা প্রায় গ্রিন কার্ডের সমতুল্য। এই ভিসা পাওয়া ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রে—

  • স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবেন

  • আইনগতভাবে কাজ করার অনুমতি পাবেন

  • ব্যবসা পরিচালনা ও বিনিয়োগ করতে পারবেন

  • দীর্ঘমেয়াদে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবেন

অর্থাৎ, কার্যত এটি গ্রিন কার্ডের বিকল্প বা উন্নত সংস্করণ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।


আবেদন প্রক্রিয়া কীভাবে?

মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, এই ভিসার জন্য আবেদন করতে হলে আগ্রহী ব্যক্তিদের একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে।

আবেদন প্রক্রিয়া সংক্ষেপে—

  1. আবেদনকারীকে প্রথমে trumpcard.gov ওয়েবসাইটে যেতে হবে

  2. সেখানে থাকা ‘Apply Now’ বাটনে ক্লিক করতে হবে

  3. অনলাইনে একটি বিস্তারিত আবেদন ফরম পূরণ করতে হবে

  4. আবেদন জমা দেওয়ার সময় দিতে হবে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার

বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৮ লাখ ২১ হাজার টাকা


প্রসেসিং ফি কোথায় যাবে?

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ১৫ হাজার ডলার নেওয়া হবে ভিসা প্রসেসিং ফি হিসেবে। এই অর্থ গ্রহণ করবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিষয়ক দপ্তর ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি

এই ধাপে আবেদনকারীর—

  • পরিচয়

  • আর্থিক সক্ষমতা

  • আইনগত অবস্থান

  • আন্তর্জাতিক ব্যাকগ্রাউন্ড

যাচাই-বাছাই করা হবে।


দ্বিতীয় ধাপে দিতে হবে ১০ লাখ ডলার

প্রাথমিক যাচাই শেষে আবেদনকারীকে জানানো হবে পরবর্তী ধাপের বিষয়ে। সেই ধাপে ভিসা অনুমোদনের জন্য আবেদনকারীকে দিতে হবে আরও ১০ লাখ মার্কিন ডলার

বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি ১৪ লাখ টাকা

ওয়েবসাইটে এই অর্থকে সরাসরি ‘Gift’ (উপহার) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নিয়ে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে।


‘গিফট’ শব্দ ব্যবহারে বিতর্ক

ভিসার অর্থকে ‘চাঁদা’ বা ‘গিফট’ হিসেবে উল্লেখ করায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেক বিশ্লেষক। তাঁদের মতে, এই শব্দচয়ন রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করছেন, এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক ব্যয়ের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হবে এবং এটি কোনো বেআইনি লেনদেন নয়।


গ্রিন কার্ডের সমতুল্য মর্যাদা

মার্কিন প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, ট্রাম্প গোল্ড ভিসার মর্যাদা গ্রিন কার্ডের সমান। অর্থাৎ—

  • যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অধিকার

  • পূর্ণাঙ্গ কর্মসংস্থানের সুযোগ

  • কর প্রদান সাপেক্ষে ব্যবসা পরিচালনা

  • পরিবার নিয়ে বসবাসের অনুমতি

এই সব সুবিধাই পাবেন গোল্ড ভিসাধারীরা।


কারা এই ভিসার জন্য যোগ্য?

যদিও প্রশাসন এখনো যোগ্যতার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করেনি, তবে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে—

  • উচ্চ নেটওয়ার্থধারী ব্যক্তি

  • আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী

  • বড় কর্পোরেশনের শীর্ষ নির্বাহী

  • যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগে আগ্রহী বিদেশি নাগরিক

এই শ্রেণির ব্যক্তিরাই মূলত এই ভিসার লক্ষ্যবস্তু।


যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রভাব

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভিসা কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র—

  • বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা পাবে

  • বিনিয়োগ বাড়াতে সক্ষম হবে

  • কর রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে

  • কর্পোরেট খাতে দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখতে পারবে

বিশেষ করে প্রযুক্তি, শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


সমালোচনা ও উদ্বেগ

তবে এই উদ্যোগের সমালোচনাও কম নয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—

  • অর্থের বিনিময়ে বসবাসের অনুমতি কি ন্যায্য?

  • সাধারণ অভিবাসীদের জন্য এটি কি বৈষম্যমূলক নয়?

  • ‘গোল্ড ভিসা’ কি কেবল ধনীদের জন্যই যুক্তরাষ্ট্রকে উন্মুক্ত করছে?

মানবাধিকার ও অভিবাসন সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে।


বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প গোল্ড ভিসা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই আগে থেকেই বিনিয়োগভিত্তিক ভিসা বা নাগরিকত্ব কর্মসূচি চালু রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের এমন সরাসরি ও উচ্চমূল্যের ভিসা কর্মসূচি আন্তর্জাতিক অভিবাসন নীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


উপসংহার

‘ট্রাম্প গোল্ড ভিসা’ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। একদিকে এটি ধনী বিদেশিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের সহজ পথ খুলে দিচ্ছে, অন্যদিকে এর অর্থনৈতিক ও নৈতিক দিক নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা প্রশ্ন।

এই ভিসা কর্মসূচি ভবিষ্যতে কতটা জনপ্রিয় হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও অভিবাসন কাঠামোতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে—তা সময়ই বলে দেবে।