সোনাডাঙ্গায় মাথা লক্ষ্য করে গুলি, গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি
খুলনায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শ্রমিক সংগঠনের বিভাগীয় আহ্বায়ক মোতালেব শিকদারকে গুলি করার ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (২২ ডিসেম্বর) দুপুরের দিকে সোনাডাঙ্গা এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার বেলা আনুমানিক ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে মোতালেব শিকদার সোনাডাঙ্গা এলাকায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় হঠাৎ করে কয়েকজন দুর্বৃত্ত তার মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলিটি তার মাথায় আঘাত করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে দ্রুত খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মাথার সিটি স্ক্যান করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পুলিশি বক্তব্য
সোনাডাঙ্গা মডেল থানার তদন্ত কর্মকর্তা (ওসি) অনিমেষ মণ্ডল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “মোতালেব নামে এক ব্যক্তিকে দুর্বৃত্তরা গুলি করেছে—এমন সংবাদ পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। স্থানীয় জনতা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে তার মাথার সিটি স্ক্যানের জন্য শেখপাড়া সিটি ইমেজিং সেন্টারে নেওয়া হয়।”
তিনি আরও জানান, ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালানো হয়েছে। হামলার পেছনে কারা জড়িত এবং কী কারণে এই হামলা চালানো হয়েছে—তা জানতে তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় এখনো কাউকে আটক করা যায়নি, তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
এ ঘটনার পর খুলনার রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এনসিপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা এই হামলাকে পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের খুলনা জেলা শাখার সদস্য সচিব সাজিদুল ইসলাম বাপ্পি এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “প্রশাসনের নীরবতা এবং নিষ্ক্রিয়তা আমাদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। খুলনা এখন কিশোর গ্যাং এবং সন্ত্রাসীদের নগরে পরিণত হয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেসব সন্ত্রাসীকে আটক করছে, তারা খুব সহজেই আদালত থেকে জামিন নিয়ে আবার আগের মতো সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
সাজিদুল ইসলাম বাপ্পি আরও বলেন, “খুলনার সাধারণ মানুষ আজ তাদের জান ও মালের নিরাপত্তা চায়। দিনের আলোতে প্রকাশ্যে গুলি চালানোর মতো ঘটনা প্রমাণ করে, অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।”
তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই কিছু অপরাধী বারবার আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরের ব্যস্ত সময় হলেও গুলির শব্দে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। অনেকে দোকানপাট বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় চুরি, ছিনতাই ও সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে, যা তাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “দিনের বেলায় এমন ঘটনা ঘটলে রাতে কী হবে—এই ভয় আমাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।”
চিকিৎসকদের ভাষ্য
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, মোতালেব শিকদারের মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার কারণে তার অবস্থা শুরুতে আশঙ্কাজনক ছিল। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা তার চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। তবে বিস্তারিত চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
তদন্তের অগ্রগতি
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। হামলাকারীরা কোন পথে এসেছে এবং কোন দিকে পালিয়েছে—তা শনাক্ত করার জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীর রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের দিকগুলোও তদন্তে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
এই গুলির ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে।
উপসংহার
খুলনায় এনসিপির শ্রমিক শক্তির বিভাগীয় আহ্বায়ক মোতালেব শিকদারকে গুলি করার ঘটনা নগরবাসীর মধ্যে নতুন করে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করেছে। দিনের আলোতে প্রকাশ্যে এ ধরনের হামলা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, বরং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
এখন দেখার বিষয়—তদন্ত কত দ্রুত অগ্রসর হয় এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে প্রশাসন কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে খুলনার সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করছে, তারা যেন নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করতে পারে।