ক্ষমতায় গেলে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বিশেষ ভাতা দেবে বিএনপি

ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা ও আলেম সমাজের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নতুন প্রতিশ্রুতি

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় এলে দেশের মসজিদভিত্তিক ধর্মীয় নেতৃত্বকে আর্থিকভাবে সহায়তার লক্ষ্যে ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য বিশেষ ভাতা চালু করা হবে—এমন ঘোষণা দিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে কোরআন ও সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করা হবে না এবং কওমি মাদ্রাসা থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) রাজধানীর গুলশানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ–এর সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতা উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।


ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা: ধর্মীয় সেবার স্বীকৃতি

সংবাদ সম্মেলনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের মসজিদগুলোতে যারা নিয়মিত ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করছেন—ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা—তাঁরা সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘদিন ধরে আর্থিকভাবে অবহেলিত। বিএনপি মনে করে, ধর্মীয় সেবা কেবল আধ্যাত্মিক নয়, এটি সামাজিক ও নৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, “আমরা ক্ষমতায় গেলে ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য বিশেষ ভাতা ব্যবস্থা চালু করব, যাতে তারা ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে সমাজের কল্যাণে কাজ করতে পারেন।” এ উদ্যোগের মাধ্যমে ধর্মীয় পেশাজীবীদের সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান তিনি।


কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী আইন না করার অঙ্গীকার

বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে দেশের ধর্মীয় অনুভূতি ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে যায়—এমন কোনো আইন পাস করা হবে না। কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিধান প্রণয়নের প্রশ্নই ওঠে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি মুসলিমপ্রধান দেশে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে সম্মান জানানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিএনপি সেই দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।


কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার

সংবাদ সম্মেলনে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, কওমি মাদ্রাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষক, ইমাম ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

তার মতে, কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত থাকেন এবং ধর্মীয় নেতৃত্ব প্রদানে তারা বিশেষভাবে উপযুক্ত। এই জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করাই বিএনপির লক্ষ্য।


জমিয়তের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতা

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, নির্বাচনি সমঝোতার অংশ হিসেবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ–এর সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে বিএনপি চারটি আসনে প্রার্থী দেবে না।

তিনি বলেন, “বিএনপির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারিত চারটি আসনে বিএনপি কোনো প্রার্থী দেবে না। এসব আসনে যদি কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে চান, তাহলে দলীয় শৃঙ্খলা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


যেসব আসনে বিএনপি প্রার্থী দেবে না

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সমঝোতার ভিত্তিতে জমিয়তের জন্য যেসব আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো—

  • নীলফামারী-১: মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী

  • নারায়ণগঞ্জ-৪: মনির হোসাইন কাসেমী

  • সিলেট-৫: আমির উবায়দুল্লাহ ফারুক

  • ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২: জুনায়েদ আল হাবিব

এই চারটি আসনে জমিয়ত মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচন করবেন বলে জানানো হয়েছে।


আসন সমঝোতার পেছনের আলোচনা

দলীয় সূত্র জানায়, শুরুতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ পাঁচটি আসনের দাবি জানিয়েছিল। আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়ে বিএনপি তিনটি আসনে সম্মত হয়। পরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান–এর সুপারিশে আরও একটি আসন যুক্ত করে মোট চারটি আসনে সমঝোতা চূড়ান্ত করা হয়।

বিএনপি নেতারা বলছেন, বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য এবং নির্বাচনে কার্যকর ভূমিকা রাখার স্বার্থেই এই সমঝোতা করা হয়েছে।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা দেওয়ার ঘোষণা এবং কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বিএনপির ধর্মীয় ভোটব্যাংককে আরও সংহত করতে পারে। একই সঙ্গে ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতা বিএনপির বৃহত্তর জোট রাজনীতিকে শক্তিশালী করার কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

তাদের মতে, এই ধরনের ঘোষণার মাধ্যমে বিএনপি ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।


উপসংহার

ক্ষমতায় গেলে ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য বিশেষ ভাতা চালু, কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন না করা এবং কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা—সব মিলিয়ে বিএনপির সাম্প্রতিক বক্তব্য দেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

একই সঙ্গে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতা বিএনপির আসন্ন নির্বাচনী কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগামী দিনে এই প্রতিশ্রুতি ও সমঝোতা বাস্তবে কীভাবে রূপ নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে থাকবে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ জনগণ।

ছবি: Staff Reporter