খুলনায় ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের কার্যালয় ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা

বিশেষ প্রতিনিধিঃ ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর খুলনায় ভারতীয় ভিসার আবেদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি ও নিরাপত্তাজনিত কারণে বর্তমানে সব কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে অনলাইনের মাধ্যমে পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে খুলনাস্থ ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের কার্যালয়কে ঘিরে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

গতকাল রোববার সকাল থেকে নগরীর শামসুর রহমান রোডে অবস্থিত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের কার্যালয়ের আশপাশে কঠোর নিরাপত্তা বলয় চোখে পড়ে। ইউসুফ আহমেদ রোডের শেষ প্রান্ত থেকে আহসান আহমেদ রোডের মোড় পর্যন্ত এলাকাজুড়ে ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা।

চার সড়ক বন্ধ, যান চলাচলে ভোগান্তি

প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহকারী হাইকমিশনার কার্যালয়ের চারপাশের অন্তত চারটি সড়কে যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে শামসুর রহমান রোডে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় নগরবাসীকে বিকল্প সড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বেড়েছে যানজট, ভোগান্তিতে পড়ছেন অফিসগামী মানুষ ও সাধারণ যাত্রীরা।

সহকারী হাইকমিশনার কার্যালয়ের পাশ্ববর্তী এলাকায় বসবাসকারী বাসিন্দারাও পড়েছেন বিপাকে। কার্যালয়ের মূল সড়কের দুই পাশে থাকা বাড়িগুলোর বাসিন্দারা বাইরে বের হতে গেলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়ছেন।

ওই এলাকার বাসিন্দা আহমেদ নামের একজন বলেন, “ব্যক্তিগত কাজে বাইরে বের হলেই পরিচয় জানতে চাওয়া হচ্ছে, কোথায় যাচ্ছি সেটাও জানতে হচ্ছে। নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা বুঝি, তবে এতে দৈনন্দিন কাজকর্মে বেশ অসুবিধা হচ্ছে।”

ভিসা কার্যক্রমে অনলাইন নির্ভরতা

এদিকে নগরীর স্যার ইকবাল রোডে অবস্থিত একাধিক ভিসা ব্রোকার প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত বুধবার দুপুরের পর থেকে ভারতীয় ভিসার অনলাইন আবেদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তবে খুলনায় সীমিত পরিসরে অনলাইন ব্যবস্থা সচল ছিল।

পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার ‘মার্চ টু ভারতীয় কনসুলেট অফিস’ কর্মসূচির ব্যানারে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা আসার পর বেলা ১২টার পর থেকে অনলাইনে ভিসা আবেদন গ্রহণও বন্ধ রাখা হয়।

স্যার ইকবাল রোডের একটি ভিসা ব্রোকার প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী সাধন সরকার বলেন, “বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত যেসব আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল, সেগুলোর ডেট (তারিখ) আজ সকাল থেকে দেওয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি আজ থেকেই নতুন করে অনলাইনে ভিসার আবেদন নেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, সরাসরি অফিসে গিয়ে কোনো ধরনের কাগজপত্র জমা দেওয়া বা যোগাযোগের সুযোগ এখনো নেই। সবকিছু অনলাইনের মাধ্যমেই সম্পন্ন করা হচ্ছে।

বিক্ষোভ মিছিলের চেষ্টা, নিরাপত্তা বাহিনীর বাধা

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা শামসুর রহমান রোডে অবস্থিত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের কার্যালয়ের দিকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে আগে থেকেই সতর্ক অবস্থানে থাকা সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা ব্যারিকেড দিয়ে তাদের আটকে দেন। ফলে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতেই আগেভাগে এই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বিকল্প সড়কে চাপ, বাড়ছে যানজট

সহকারী হাইকমিশনার কার্যালয়ের পাশ্ববর্তী সড়কগুলো বন্ধ থাকায় বিকল্প পথ হিসেবে প্রেসক্লাবের পাশের সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। এতে ওই এলাকায় যানবাহনের চাপ বেড়ে গেছে, সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট।

রিকশাচালক আবু তালেব বলেন, “ইউসুফ আহমেদ রোড দিয়ে যাত্রী নিয়ে আযম খান কমার্স কলেজের দিকে যাচ্ছিলাম। সিভিল সার্জন অফিসের কাছে গিয়ে দেখি রাস্তা ব্যারিকেড দেওয়া। এখন অনেক ঘুরপথে যেতে হচ্ছে। যাত্রী তো ২০ টাকার ভাড়া ৪০ টাকা দেবে না। রাস্তাটা দ্রুত খুলে দেওয়া দরকার।”

পুলিশের বক্তব্য

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মো. তাজুল ইসলাম বলেন, “ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার অফিসের সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনায় সেখানে পুলিশ, ডিবি, নৌ ও সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নগরীর সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “ঢাকার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শামসুর রহমান রোডসহ বন্ধ সড়কগুলো ধাপে ধাপে খুলে দেওয়া হবে। নগরীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে।”

নগরবাসীর প্রত্যাশা

এদিকে সাধারণ নগরবাসী নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা মেনে নিলেও দ্রুত যান চলাচল স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন সড়ক বন্ধ থাকলে অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শিগগিরই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল করা হবে এবং নগরজীবন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে।

ছবি: নিউজ ডেস্ক -খায়রুজ্জামান