স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোটে লড়লে ব্যবস্থা নেবে বিএনপি

দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানের ঘোষণা, আসন সমঝোতার বিস্তারিত তুলে ধরলেন নেতারা

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক ঐক্য বজায় রাখতে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ যদি জাতীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক পরিবেশ এবং দলীয় জোট ও আসন সমঝোতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা।


দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, জাতীয় নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় দলীয় শৃঙ্খলা ও ঐক্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। তিনি স্পষ্ট করে জানান, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে তা দলীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হবে।

মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। এখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয় দলীয় ফোরামে আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে। সে সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে দল তা মেনে নেবে না।

তার ভাষায়, “দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখাই আমাদের লক্ষ্য।”


নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও উদ্বেগ

সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেবে—এটাই প্রত্যাশা।

তিনি বলেন, “আমরা আশা করি, নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার আসবে, তারা দেশকে কল্যাণের পথে এগিয়ে নেবে।” তবে একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, একটি মহল নির্বাচন প্রক্রিয়া ব্যাহত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।

বিএনপি মহাসচিবের মতে, নির্বাচনকে ঘিরে দেশে যে রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হওয়া দরকার, তা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। তিনি এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকার আহ্বান জানান।


আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের প্রতি যে আস্থা ও দায়িত্ব রয়েছে, সরকার সেটি বজায় রাখবে—এমন প্রত্যাশা বিএনপির। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে সরকারকে আরও সতর্ক ও সচেতন ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান তিনি।


আসন সমঝোতা: জমিয়াতুল উলামায়ে ইসলামের সঙ্গে ঐকমত্য

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব জানান, বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা রাজনৈতিক দল জমিয়াতুল উলামায়ে ইসলাম-কে চারটি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

এই আসনগুলো হলো—

  • নীলফামারী-১

  • নারায়ণগঞ্জ-৪

  • সিলেট-৫

  • ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২

তিনি জানান, এসব আসনে জমিয়াতুল উলামায়ে ইসলামের প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেবেন এবং সেখানে বিএনপি কোনো প্রার্থী দেবে না।


যুগপৎ আন্দোলনের স্বীকৃতি

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অতীতে যুগপৎ আন্দোলনে জমিয়াতুল উলামায়ে ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক আন্দোলনে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থার ভিত্তিতেই আসন সমঝোতা হয়েছে। যেসব আসনে জমিয়াতুল উলামায়ে ইসলামের প্রার্থীরা নির্বাচন করবেন, সেসব আসনে বিএনপি কোনোভাবেই প্রার্থী দেবে না।

তার মতে, এই সমঝোতা রাজনৈতিক সৌহার্দ্য ও ঐক্যের একটি দৃষ্টান্ত।


ধর্মীয় বিষয়ে বিএনপির অবস্থান

সংবাদ সম্মেলনে সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের কল্যাণে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি জানান—

  • ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা হবে

  • কোরআন ও সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন পাস করা হবে না

  • কওমি মাদরাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে

তার বক্তব্য অনুযায়ী, ধর্মীয় শিক্ষা ও মূল্যবোধকে সম্মান জানিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি গ্রহণ করবে বিএনপি।


দলীয় শৃঙ্খলা ও নির্বাচনি কৌশল

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থান বিএনপির দলীয় শৃঙ্খলা জোরদার করার একটি কৌশল। নির্বাচনের সময় দলীয় কোন্দল বা বিভক্তি যাতে ভোটের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়টি মাথায় রেখেই এই বার্তা দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে জোট ও সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিশ্চিত করাও বিএনপির কৌশলের অংশ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।


উপসংহার

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি একদিকে যেমন দলীয় শৃঙ্খলা কঠোরভাবে বজায় রাখার বার্তা দিয়েছে, অন্যদিকে জোট ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ঐক্য জোরদার করার কৌশল নিয়েছে।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ, এবং ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয় নিয়ে প্রতিশ্রুতি—সব মিলিয়ে বিএনপির এই সংবাদ সম্মেলন নির্বাচনি রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিয়েছে।

আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ঘোষণাগুলোর কী প্রভাব পড়ে, সেদিকে এখন নজর থাকবে দেশবাসীর।

ছবি: নিউজ ডেস্ক ফাইল