স্টাফ রিপোর্ট | দৈনিক খুলনা
খুলনা শহরের অন্যতম দীর্ঘদিনের ও জনভোগান্তির বড় সমস্যা হলো ড্রেনেজ ব্যবস্থা। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন সড়ক, গলি ও আবাসিক এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতার কারণে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সৃষ্টি হয় স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিত্যদিনের দুর্ভোগ।
ড্রেনেজ সমস্যার প্রধান কারণ
খুলনা শহরের ড্রেনেজ সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
১. অপরিকল্পিত নগরায়ন
শহরের দ্রুত সম্প্রসারণ হলেও সে অনুযায়ী আধুনিক ও সমন্বিত ড্রেনেজ নকশা তৈরি হয়নি। অনেক নতুন ভবন ও সড়ক নির্মাণের সময় প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
২. ড্রেন ও খাল দখল
শহরের বিভিন্ন খাল ও নালা দখল হয়ে যাওয়ায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও অবৈধ স্থাপনা, কোথাও আবার ময়লা-আবর্জনায় খাল সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
৩. ময়লা-আবর্জনা ফেলার প্রবণতা
অনেক স্থানে ড্রেনে পলিথিন, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি বর্জ্য ফেলার কারণে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে।
৪. নিয়মিত পরিষ্কারের অভাব
ড্রেনেজ লাইনের নিয়মিত সংস্কার ও পরিষ্কার কার্যক্রম না থাকায় পলি ও ময়লা জমে কার্যকারিতা হারাচ্ছে বহু ড্রেন।
জলাবদ্ধতার প্রভাব
ড্রেনেজ সমস্যার কারণে খুলনা শহরের বাসিন্দারা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় রাস্তাঘাট নষ্ট হচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি হচ্ছে এবং ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
সম্ভাব্য সমাধান
খুলনা শহরের ড্রেনেজ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ—
১. আধুনিক মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন
সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ নিশ্চিত করতে হবে।
২. খাল পুনরুদ্ধার ও দখলমুক্তকরণ
শহরের সব খাল ও প্রাকৃতিক জলাধার উদ্ধার করে নিয়মিত খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
৩. নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম
ড্রেন ও নালার নিয়মিত পরিষ্কার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ময়লা ফেলার বিষয়ে কঠোর নজরদারি ও জরিমানা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
৪. নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি
ড্রেনে বর্জ্য না ফেলা ও পরিবেশবান্ধব আচরণ গড়ে তুলতে নাগরিকদের সচেতন করতে হবে।
ঐতিহ্য, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও জলাবদ্ধতার গভীর সংকট
খুলনা দক্ষিণবঙ্গের একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জেলা। ১৮৮২ সালে জেলা হিসেবে যাত্রা শুরু করা খুলনার বর্তমান আয়তন ৪ হাজার ৩৯৪.৪৬ বর্গকিলোমিটার। ১৯৬০ সালে খুলনা বিভাগ গঠিত হয়। নগর প্রশাসনের ইতিহাসেও খুলনার রয়েছে দীর্ঘ পথচলা—১২ ডিসেম্বর ১৮৮৪ সালে পৌরসভা, ১২ ডিসেম্বর ১৯৮৪ সালে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন এবং সর্বশেষ ৬ আগস্ট ১৯৯০ সালে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয় খুলনা।
বর্তমানে খুলনা মহানগরীর আয়তন ৪৫.৬৫ বর্গকিলোমিটার। সিটি করপোরেশন এলাকায় জনসংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। ৭টি থানা ও ৩১টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই মহানগরী দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর হিসেবে পরিচিত। শহরটির অবস্থান দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে, রূপসা ও ভৈরব নদীর তীরে। উত্তরে রাজশাহী বিভাগ, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ঢাকা ও বরিশাল বিভাগ এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার দক্ষিণাংশজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবন এ অঞ্চলের ভৌগোলিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
নগর অবকাঠামো বনাম বাস্তবতা
খুলনা সিটির সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ৩৫৬.৬৪ কিলোমিটার এবং ড্রেনের মোট দৈর্ঘ্য ৬৪২.১৮ কিলোমিটার। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় ৬৭,৯৯৪ জন (সূত্র: বাংলা পিডিয়া)। তবে পরিসংখ্যান যত বড়ই হোক, বাস্তবতায় খুলনা শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। বর্ষা মৌসুমে অল্প বৃষ্টিতেই নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে যায়।
খুলনার ড্রেনেজ ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো খোলা ড্রেন। মোট ড্রেনের অধিকাংশই খোলা ও কাঁচা, যা বছরের অধিকাংশ সময় কাদায় পরিপূর্ণ থাকে। বসতবাড়ি ও কলকারখানার বর্জ্য, নিষিদ্ধ পলিথিন, পণ্যের মোড়কসহ নানা ধরনের আবর্জনা নিয়মিত এসব ড্রেনে ফেলার ফলে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক গতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
খাল দখল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট
জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নগরীর বহু খাল ও পুকুর দখল ও ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও সিটি করপোরেশনের অনুমতি ছাড়াই ড্রেনের ওপর দোকান ও বাজার গড়ে ওঠায় জলাবদ্ধতা আরও প্রকট হয়েছে। যদিও নির্দিষ্ট সময় পরপর পলি-কাদা অপসারণ করা হয়, তবে কিছুদিনের মধ্যেই ড্রেনগুলো আবারও ভরাট হয়ে পড়ে।
সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, খুলনা শহরে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এ বিপুল বর্জ্যের একটি বড় অংশ খোলা ড্রেনে নিক্ষেপ করার কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়ছে। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে নগরীর বড় অংশ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। বর্ষায় জলাবদ্ধতা আর শুষ্ক মৌসুমে দুর্গন্ধ—দুটোই নগরবাসীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
নদী-খাল ভরাট ও দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তি
নগরীর বর্জ্য আশপাশের ড্রেন দিয়ে এসে ময়ূর নদী ও হাতিয়া খালে জমা হওয়ায় এসব জলাধার ভরাট হয়ে পড়ছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো পানিতে তলিয়ে যায় এবং পানি নিষ্কাশনে দীর্ঘ সময় লাগে। একসময় খাল হিসেবে পরিচিত জলাধারগুলো এখন অনেক স্থানে ছোট ড্রেনে পরিণত হয়েছে, যার ফলে বর্ষাকালে পানি বের হওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
উন্নয়নের সম্ভাবনা ও জলাবদ্ধতার বাধা
দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর হিসেবে খুলনার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দরের নিকটবর্তী অবস্থান, পদ্মা সেতু চালুর পর অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে খুলনার সম্ভাবনা বিপুল। সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিদিন কয়েক লাখ মানুষের চলাচলে শহরটি ব্যস্ত থাকে।
একসময় শিল্প নগরী হিসেবে পরিচিত খুলনায় ছিল অসংখ্য পাটকল, নিউজপ্রিন্ট ও হার্ডবোর্ড মিল। যদিও অতীতে শিল্পখাতের মন্দায় সেই পরিচয় ম্লান হয়েছিল, তবে বর্তমানে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস মিলছে। বেসরকারি উদ্যোগে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, জুটমিল এবং খুলনা শিপইয়ার্ডের লাভজনক অবস্থান এ শহরের অর্থনীতিতে নতুন গতি এনেছে।
করণীয় কী
এই বিপুল সম্ভাবনার পথে সবচেয়ে বড় বাধা যেন জলাবদ্ধতা না হয়—এটাই নগরবাসীর প্রত্যাশা। জলাবদ্ধতা শুধু বর্ষাকালের সমস্যা নয়, সারা বছরই কোনো না কোনোভাবে এর প্রভাব থাকে। পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ময়ূর নদীসহ অন্যান্য খাল খনন, নতুন ও আধুনিক ড্রেন নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সরকারের আন্তরিকতা এবং নগরবাসীর সচেতন অংশগ্রহণই পারে খুলনাকে একটি পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও আধুনিক নগরীতে রূপান্তর করতে।