অপহরণ মামলার সূত্র ধরে বটিয়াঘাটায় উদ্ধার হওয়া মাথাবিহীন নারীর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন

৪০ দিনের অভিযান শেষে মূল আসামি গ্রেফতার, উদ্ধার হলো হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত

বটিয়াঘাটায় প্রতিনিধি | খুলনা

অপহরণ মামলার তদন্ত করতে গিয়ে বটিয়াঘাটায় উদ্ধার হওয়া মাথাবিহীন এক অজ্ঞাতনামা নারীর হত্যার জট খুলে দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), খুলনা। দীর্ঘ ৪০ দিনের নিবিড় তদন্ত, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং একাধিক জেলায় ধারাবাহিক অভিযানের পর এ ঘটনায় মূল আসামি মোঃ লালন গাজীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পিবিআই। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ আলামতও উদ্ধার করা হয়েছে।

পিবিআই সূত্রে জানা যায়, খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানাধীন সাজিয়াড়া গ্রামের বাসিন্দা শামিম ফকির (৩০) তার মা সালেহা বেগমের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় গত আগস্ট মাসে আদালতে একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। মামলায় একই গ্রামের বাসিন্দা মোঃ লালন গাজীকে প্রধান আসামি করা হয়। আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই খুলনা ইউনিট।

নিখোঁজের রহস্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা

তদন্তের একপর্যায়ে পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় জানতে পারেন, ভিকটিম সালেহা বেগম দীর্ঘদিন ধরে পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানী থানাধীন এলাকায় বসবাস করছিলেন। তবে ১৯ আগস্ট ২০২৫ সালের সন্ধ্যার পর থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। বিষয়টি তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত করে।

পরবর্তী অনুসন্ধানে উঠে আসে, সালেহা বেগম ও আসামি লালন গাজী ইন্দুরকানীর চাড়াখালী গ্রামে একটি ভাড়া বাসায় স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে একসঙ্গে বসবাস করছিলেন। স্থানীয়দের সঙ্গেও তারা ওই পরিচয়েই চলাফেরা করতেন বলে তদন্তে জানা যায়।

বটিয়াঘাটায় যাত্রা ও লাশ উদ্ধারের ঘটনা

তদন্তে আরও জানা যায়, ১৯ আগস্ট সন্ধ্যায় ভিকটিম সালেহা বেগম ও আসামি লালন গাজী খুলনার বটিয়াঘাটা থানাধীন গজালিয়া গ্রামে যাওয়ার কথা বলে একসঙ্গে ভাড়া বাসা থেকে বের হন। এরপর থেকে সালেহা বেগমের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এর ঠিক পরদিন, ২০ আগস্ট বিকেলে বটিয়াঘাটা থানার সুরখালী ইউনিয়নের সুখদাড়া গ্রামে ঝপঝপিয়া নদী থেকে মাথাবিহীন এক নারীর মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মৃতদেহটির পরিচয় শনাক্ত করা না যাওয়ায় সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয় এবং বটিয়াঘাটা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

পরিচয় শনাক্ত ও তদন্তের মোড়

মৃতদেহ উদ্ধারের পর অপহরণ মামলার তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়। পিবিআই খুলনার ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত স্থিরচিত্র ও আলামত অপহরণ মামলার বাদী শামিম ফকির ও তার পরিবারের সদস্যদের দেখান। তারা মৃত নারীর পরিধেয় বস্ত্র ও শারীরিক গঠনের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে মৃতদেহটি সালেহা বেগমের বলে শনাক্ত করেন।

এরপর হত্যা মামলাটি পিবিআইয়ের সিডিউলভুক্ত হলে সংস্থাটি স্বউদ্যোগে উভয় মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে। এ সময় থেকেই অপহরণ মামলার আসামি লালন গাজী পলাতক ছিলেন।

দেশজুড়ে অভিযান ও গ্রেফতার

পিবিআই সূত্র জানায়, সংস্থার প্রধান মোঃ মোস্তফা কামাল, এ্যাডিশনাল আইজিপি’র তত্ত্বাবধান এবং খুলনা জেলা ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন, পিপিএম-সেবা’র নেতৃত্বে একটি চৌকস তদন্ত দল গঠন করা হয়। দলটি সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে।

দীর্ঘ অনুসন্ধান ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অবশেষে গত ১৮ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক সময়ে সুনামগঞ্জ সদর থানাধীন হালুয়ারঘাট বাজার সংলগ্ন খেয়াঘাট এলাকা থেকে মোঃ লালন গাজীকে গ্রেফতার করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি

গ্রেফতারের পর পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদে আসামি লালন গাজী হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ভিকটিম সালেহা বেগমের ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ১৪ লাখ টাকা উত্তোলন করে নেন তিনি। এছাড়া ভিকটিমের পক্ষ থেকে বিয়ের জন্য চাপ দেওয়ায় তিনি হত্যার পরিকল্পনা করেন।

আসামির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট বিকেলে বটিয়াঘাটার পার বটিয়াঘাটা খেয়াঘাট এলাকায় সহযোগীদের সহায়তায় সালেহা বেগমকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ ঝপঝপিয়া নদীতে ফেলে দেওয়া হয় বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানায় লালন গাজী।

আলামত উদ্ধার ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ

পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় আসামির দেখানো মতে বটিয়াঘাটা থানাধীন গজালিয়া গ্রামে তার এক আত্মীয়ের বাড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে ভিকটিমের ব্যবহৃত মালামাল ও পরিধেয় বস্ত্র উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত আলামত মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে।

পিবিআই সূত্র জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আসামিকে পুনরায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যান্য অজ্ঞাতনামা সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

শেষ কথা

অপহরণ মামলার সূত্র ধরে মাথাবিহীন এক নারীর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের এই ঘটনা খুলনাসহ সারাদেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। পিবিআইয়ের দীর্ঘ তদন্ত ও সমন্বিত অভিযানে অপরাধের জট খুলে আসায় সংস্থাটির পেশাদারিত্বের দৃষ্টান্ত আরও একবার সামনে এলো। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যেই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে জড়িত সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *