বিটরুট খাওয়ার পর লাল প্রস্রাব: রোগের লক্ষণ নাকি স্বাভাবিক ঘটনা?

হঠাৎ করে প্রস্রাবের রং লাল বা গোলাপি দেখলে যে কারও মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। প্রথমেই অনেকের মনে প্রশ্ন আসে—প্রস্রাবের সঙ্গে কি রক্ত যাচ্ছে? কিডনিতে কি কোনো বড় সমস্যা হয়েছে? বিষয়টি ভয়ংকর মনে হলেও বাস্তবতা হলো, সব সময় লাল প্রস্রাব মানেই গুরুতর রোগ নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি খাদ্যাভ্যাস বা কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও হতে পারে। বিশেষ করে বিটরুট খাওয়ার পর লাল রঙের প্রস্রাব দেখা দেওয়া একটি পরিচিত ও সাধারণ ঘটনা।

বিটরুট ও প্রস্রাবের রং পরিবর্তনের কারণ

বিটরুট একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর সবজি। এতে রয়েছে আয়রন, ফোলেট, পটাশিয়াম, ফাইবার ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। তবে বিটের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এতে থাকা বিটানিন নামক প্রাকৃতিক লাল রঞ্জক। এই রঞ্জকই বিটকে তার গাঢ় লাল বা বেগুনি রং দেয়।

সব মানুষের শরীর এই বিটানিন পুরোপুরি ভেঙে ফেলতে পারে না। যাদের ক্ষেত্রে এই রঞ্জক সম্পূর্ণভাবে হজম হয় না, তাদের শরীর এটি প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। ফলে প্রস্রাব লাল বা গোলাপি দেখাতে পারে। এই অবস্থাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় “বিটুরিয়া” (Beeturia)।

বিটুরিয়া কি কোনো রোগ?

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিটুরিয়া কোনো রোগ নয়। এটি একটি অস্থায়ী ও নিরীহ অবস্থা। সাধারণত বিটরুট, বিটের সালাদ, বিটের জুস বা বিট দিয়ে তৈরি খাবার খাওয়ার ৬ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রস্রাবের রং পরিবর্তন দেখা যায়। কিছু সময় পর শরীর থেকে বিটানিন বের হয়ে গেলে প্রস্রাব আবার স্বাভাবিক রঙে ফিরে আসে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের আয়রনের ঘাটতি রয়েছে বা যাদের হজম ক্ষমতা তুলনামূলক সংবেদনশীল, তাদের মধ্যে বিটুরিয়া হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা বেশি। তবে এটি কিডনির ক্ষতি করে না এবং কোনো দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার কারণও নয়।

সব লাল প্রস্রাব কি বিটুরিয়ার কারণে হয়?

উত্তর হলো—না। প্রস্রাব লাল হওয়া মানেই যে তা সবসময় বিটরুটের কারণে হবে, এমন নয়। বিট না খেয়েও প্রস্রাবের রং লাল হলে সেটিকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ অনেক সময় এটি প্রস্রাবে রক্ত যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয় হেমাটুরিয়া

এক্ষেত্রে চোখে দেখা যায় এমন লাল রঙের প্রস্রাব নাও হতে পারে। কখনো কখনো প্রস্রাব দেখতে স্বাভাবিক হলেও পরীক্ষায় রক্তের উপস্থিতি ধরা পড়ে। তাই প্রস্রাবের রং পরিবর্তন বা সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে পরীক্ষা করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

প্রস্রাব লাল হওয়ার অন্যান্য নিরীহ কারণ

খাদ্য ও ওষুধের কারণে প্রস্রাবের রং লালচে বা বাদামি হতে পারে। যেমন—

  • বিটরুট, ব্ল্যাকবেরি বা রঙিন খাবার
  • কিছু অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন সিপ্রোফ্লক্সাসিন, সেফালোস্পোরিন, নাইট্রোফুরানটয়েন)
  • যক্ষ্মার কিছু ওষুধ
  • অতিরিক্ত শরীরচর্চা বা ভারী ব্যায়াম

এই ক্ষেত্রে প্রস্রাবের রং বদলালেও তা সাধারণত ক্ষতিকর নয় এবং ওষুধ বা খাবার বন্ধ হলে নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়।

কখন লাল প্রস্রাব উদ্বেগের কারণ?

নিম্নোক্ত পরিস্থিতিতে প্রস্রাব লাল হলে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে—

  • বিট বা লাল রঙের খাবার না খেয়েও প্রস্রাব লাল হওয়া
  • প্রস্রাবের সঙ্গে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া
  • জ্বর, কাঁপুনি বা তলপেটে ব্যথা
  • প্রস্রাব করতে কষ্ট হওয়া
  • প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া

এই উপসর্গগুলো থাকলে এটি কিডনি, মূত্রনালি বা মূত্রাশয়ের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

কিডনি ও মূত্রতন্ত্রের সম্ভাব্য সমস্যা

প্রস্রাবে রক্ত যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে—

১. সংক্রমণ বা প্রদাহ:
মূত্রনালীর সংক্রমণ হলে প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাব, জ্বর ও তলপেটে ব্যথা দেখা দেয়।

২. কিডনি বা মূত্রনালির পাথর:
এক্ষেত্রে তীব্র ব্যথা হয়, যা পিঠের দিক থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামতে থাকে। অনেক সময় এই ব্যথা এতটাই তীব্র হয় যে রোগী স্বাভাবিকভাবে বসে থাকতে পারেন না।

৩. যক্ষ্মা সংক্রমণ:
মূত্রতন্ত্রের যক্ষ্মায় অনেক সময় ব্যথা ছাড়াই প্রস্রাবে রক্ত যেতে পারে।

৪. প্রস্টেট গ্রন্থির সমস্যা (পুরুষদের ক্ষেত্রে):
প্রস্টেট বড় হয়ে গেলে বা প্রদাহ হলে প্রস্রাবে রক্তপাত হতে পারে।

৫. রক্তের রোগ ও ক্যানসার:
কিডনি বা মূত্রাশয়ের ক্যানসার ছাড়াও রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যায় প্রস্রাবে রক্ত যেতে পারে।

কী করবেন প্রস্রাব লাল দেখলে?

প্রস্রাবের রং লাল হলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন—

  • সম্প্রতি কি বিট বা লাল রঙের খাবার খেয়েছেন?
  • নতুন কোনো ওষুধ শুরু করেছেন কি না?

যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করুন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রং স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

তবে যদি রং স্বাভাবিক না হয় বা সঙ্গে অন্য উপসর্গ থাকে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

প্রয়োজনীয় পরীক্ষা

চিকিৎসক সাধারণত যেসব পরীক্ষা দিতে পারেন—

  • প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা
  • প্রস্রাবের কালচার (সংক্রমণ শনাক্তে)
  • আলট্রাসনোগ্রাম বা এক্স-রে
  • প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা

এই পরীক্ষাগুলোতেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমস্যার কারণ ধরা পড়ে।

শেষ কথা

বিটরুট খাওয়ার পর লাল প্রস্রাব দেখা দেওয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিরীহ এবং সাময়িক একটি ঘটনা। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তবে প্রস্রাবের রং পরিবর্তন সবসময় অবহেলা করা উচিত নয়। খাদ্য বা ওষুধ ছাড়াও এটি গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে। তাই সচেতন থাকুন, নিজের শরীরের পরিবর্তন লক্ষ্য করুন এবং প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা ও সময়মতো পদক্ষেপই পারে বড় জটিলতা থেকে রক্ষা করতে।

মেডিসিন বিভাগ, ইউনাইটেড হাসপাতাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *