কেন বিশ্বের পাসপোর্ট মাত্র চারটি রঙে সীমাবদ্ধ: ইতিহাস, রাজনীতি ও প্রযুক্তির অজানা গল্প

পাসপোর্ট আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিচয়পত্র। বিদেশ ভ্রমণ, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই ছোট বইটির গুরুত্ব অপরিসীম। তবে অনেকেই কখনো ভেবে দেখেন না—হাজার হাজার রঙের মধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ কেন মাত্র চারটি রঙের পাসপোর্ট ব্যবহার করে?

আজকের এই প্রবন্ধে আমরা জানব পাসপোর্টের রঙের পেছনের ইতিহাস, রাজনৈতিক তাৎপর্য, ধর্মীয় প্রভাব, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং আধুনিক বৈশ্বিক মানদণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত।


🎨 পাসপোর্টের চারটি প্রধান রঙ

বিশ্বব্যাপী প্রচলিত পাসপোর্ট রঙ মূলত চারটি:

  1. লাল (Red / Burgundy)

  2. নীল (Blue)

  3. সবুজ (Green)

  4. কালো (Black)

এই চারটি রঙের প্রতিটির পেছনে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ ও ইতিহাস।


🔴 লাল রঙ: ইউরোপীয় ঐক্য ও ঐতিহাসিক বন্ধন

লাল বা গাঢ় লাল (বারগান্ডি) রঙের পাসপোর্ট ইউরোপের দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশিরভাগ সদস্য দেশ এই রঙ ব্যবহার করে, যা এক ধরনের ঐক্য ও সমন্বয়ের প্রতীক।

এছাড়া যেসব দেশের সঙ্গে ইউরোপের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বা ঔপনিবেশিক সম্পর্ক ছিল, তারাও অনেক সময় এই রঙ বেছে নিয়েছে।


🔵 নীল রঙ: নতুন বিশ্ব ও স্বাধীনতার প্রতীক

নীল রঙের পাসপোর্ট মূলত উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই রঙকে অনেক সময় “নতুন বিশ্বের” প্রতীক বলা হয়।

নীল রঙ স্থিতিশীলতা, আস্থা এবং স্বাধীনতার ভাব প্রকাশ করে—যা অভিবাসী-নির্ভর দেশগুলোর সঙ্গে সাংস্কৃতিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।


🟢 সবুজ রঙ: ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়

সবুজ রঙ ইসলামি দেশগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ইসলামে সবুজ রঙকে পবিত্র ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

এ কারণে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং কিছু দক্ষিণ এশীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ সবুজ পাসপোর্ট ব্যবহার করে।


⚫ কালো রঙ: মর্যাদা ও ব্যবহারিক সুবিধা

কালো রঙ দেখতে সাধারণ হলেও এটি অত্যন্ত ব্যবহারিক। কালো পাসপোর্টে ময়লা, আঁচড় বা ক্ষয় সহজে চোখে পড়ে না।

এছাড়া এটি আনুষ্ঠানিকতা, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় পরিচয় এবং দীর্ঘস্থায়িত্বের প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।


🏭 প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা: রঙ বাছাইয়ের গোপন কারণ

পাসপোর্ট শুধু একটি কাগজের বই নয়—এটি একটি উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন নথি। এর কভার তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়:

  • বিশেষ টেকসই কাগজ

  • নিরাপত্তা ফাইবার

  • অ্যান্টি-ট্যাম্পার ল্যামিনেশন

  • ইউভি-প্রতিরোধী কালি

এই উপকরণগুলো হালকা বা উজ্জ্বল রঙে ভালোভাবে কাজ করে না। গাঢ় রঙেই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও মান বজায় রাখা সম্ভব।


🌈 ব্যতিক্রমী রঙের পাসপোর্ট কেন বিরল?

বিশ্বে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি দেশ ঐতিহ্যবাহী চার রঙের বাইরে গেছে। এর কারণ মূলত খরচ, প্রযুক্তিগত ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা।

উজ্জ্বল বা ব্যতিক্রমী রঙে পাসপোর্ট তৈরি করলে দ্রুত ক্ষয়, নিরাপত্তা দুর্বলতা এবং সীমান্তে শনাক্তকরণ সমস্যার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।


🛂 আধুনিক পাসপোর্ট ও বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিং

বর্তমানে পাসপোর্টের শক্তি শুধু রঙে নয়, বরং তার মাধ্যমে কতটি দেশে ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করা যায়, নাগরিকের স্বাধীনতা কতটা, এবং দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ আছে কিনা—এসব বিষয়েও নির্ভর করে।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সূচক এই বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে পাসপোর্টের মান নির্ধারণ করে, যা বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও ভ্রমণকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়।


✈️ বাংলাদেশি পাঠকের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীদের জন্য পাসপোর্টের মান, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রঙের পাশাপাশি প্রযুক্তি, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নতি আনাই ভবিষ্যতের মূল চাবিকাঠি।


🔚 উপসংহার

পাসপোর্টের রঙ কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। এর পেছনে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক অবস্থান এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়।

চারটি রঙের এই সীমাবদ্ধতা আসলে বৈশ্বিক সমন্বয়, নিরাপত্তা ও ব্যবহারিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।

পরবর্তীবার পাসপোর্ট হাতে নিলে, তার রঙের পেছনের এই অদৃশ্য গল্পগুলো নিশ্চয়ই নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করবে। Photo: Staff Reporter