বাংলাদেশ দুষ্টচক্রের কবলে অর্থনীতি

রক্তক্ষরণ থামলেও আস্থাহীনতায় স্থবির বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের সার্বিক অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তবে এটুকু বলা যায়, অর্থনীতির লাগামহীন রক্তক্ষরণ থেমেছে। একসময়ের ব্যাপক লুটপাট ও অর্থপাচারের প্রবণতায় লাগাম পড়েছে, থামানো গেছে অর্থনীতির নিম্নমুখী যাত্রা। ডলার সংকট অনেকটাই কেটে গেছে, টাকার মানে ফিরে এসেছে আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা। মূল্যস্ফীতিও ধীরে ধীরে নিম্নমুখী হলেও তা এখনো ঝুঁকির পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রধান চালিকাশক্তি—আস্থা—এখনো ফেরেনি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার ও বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে অর্থনীতি এক ধরনের দুষ্টচক্রে আটকে পড়েছে।

বৈদেশিক খাতে স্বস্তি, অভ্যন্তরীণ খাতে অস্বস্তি

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া বহুমুখী পদক্ষেপের ফলে অর্থনীতির বৈদেশিক খাতে উল্লেখযোগ্য স্বস্তি ফিরে এসেছে। অর্থপাচার কমেছে, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এর ফলে বাজারে ডলারের চাপ কমেছে এবং টাকার মান স্থিতিশীল হয়েছে। একসময় যেখানে ডলারের দাম সর্বোচ্চ ১৩২ টাকায় পৌঁছেছিল, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১২২ টাকার আশপাশে।

গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত এই প্রবৃদ্ধি ১৭ শতাংশেরও বেশি। রপ্তানি আয় গত অর্থবছরে বেড়েছে প্রায় পৌনে ৮ শতাংশ। যদিও চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে গড় প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম, তবুও নেতিবাচক ধারা থেকে বেরিয়ে আসাটাই বড় অর্জন। বিগত সরকারের সময় হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হয়ে যাচ্ছিল, যা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে।

আমদানি ও রিজার্ভে উন্নতি

এক সময় আমদানির নামে ব্যাপক অর্থপাচার হলেও বর্তমানে তা বহুলাংশে কমেছে। ডলার সংকটের কারণে ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আমদানি ছিল নিম্নমুখী। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। যদিও আমদানি বাড়ছে, তবে তা এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে। গত অর্থবছরে আমদানি বেড়েছিল প্রায় ২ শতাংশ, আর চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেড়েছে ১০ শতাংশের বেশি।

সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। একসময় নিট রিজার্ভ নেমে এসেছিল প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারে। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বকেয়া বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ পরিশোধ হওয়ায় ডলার বাজারে চাপ কমেছে।

রপ্তানি খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ

যদিও সামগ্রিকভাবে বৈদেশিক খাতে স্বস্তি এসেছে, তবে রপ্তানি খাত সাম্প্রতিক সময়ে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক ও দেশীয় নানা কারণে টানা চার মাস ধরে রপ্তানি আয় কমেছে। রপ্তানি খাতের কাঁচামাল আমদানি কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ, যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। এর অর্থ হলো আগামীতে রপ্তানি উৎপাদন আরও চাপের মুখে পড়তে পারে।

তবে আশার দিক হলো শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি বেড়েছে। এর ফলে মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদে শিল্প উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

ব্যাংক খাত: লুটপাট বন্ধ, কিন্তু ক্ষত গভীর

ব্যাংক খাতই বর্তমানে অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল অংশ। বিগত সরকারের সময় নজিরবিহীন লুটপাটে ব্যাংক খাত কার্যত ‘রক্তশূন্য’ হয়ে পড়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই লুটপাট বন্ধ হলেও আগের ক্ষত এখন একে একে প্রকাশ পাচ্ছে। ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হু হু করে বেড়েছে।

একসময় খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায়। মাত্র সোয়া এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। এর প্রভাবে ব্যাংক খাতের সব সূচকে ধস নেমেছে, তারল্য ব্যবস্থায় চাপ বেড়েছে।

যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সহায়তা দিচ্ছে, তবুও তারল্য সংকট, কঠোর নীতিমালা এবং উদ্যোক্তাদের ঋণ নেওয়ার অনীহার কারণে ঋণ বিতরণ বাড়ছে না।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান: স্থবিরতার বৃত্ত

অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তারা কেবল চলমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, তাও অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছেন।

গত অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবরে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে মাত্র দশমিক ৬৭ শতাংশ, যেখানে আগের বছর একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল অনেক বেশি। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে।

বিদেশি বিনিয়োগের অবস্থাও একই। নতুন বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় স্থবির। মূলত কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ঋণ ও মুনাফা পুনঃবিনিয়োগ দেখিয়ে বিনিয়োগের পরিসংখ্যান কিছুটা বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার: দ্বিমুখী চাপ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গত চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এর ফলে বাজারে টাকার প্রবাহ কমেছে, কিন্তু সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ থেকে ১৮ শতাংশে। এতে একদিকে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও উৎপাদন আরও চাপে পড়েছে।

এক সময় মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছালেও বর্তমানে তা কমে ৮ শতাংশের ঘরে এসেছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের সঞ্চয় ভেঙে গেছে। স্বল্প আয়ের মানুষ এখন ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।

দুষ্টচক্র থেকে বেরোনোর চ্যালেঞ্জ

বর্তমান অর্থনীতির বড় সমস্যা হলো—একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে। উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগ কমাচ্ছে, বিনিয়োগ না থাকায় কর্মসংস্থান বাড়ছে না, কর্মসংস্থান না বাড়ায় মানুষের আয় কমছে, আয় কমায় ভোগ কমছে, ভোগ কমায় উৎপাদন বাড়ছে না। এই চক্র ভাঙতে না পারলে অর্থনীতির গতি ফেরানো কঠিন হবে।

তবে আশার দিকও আছে। ব্যাংক খাতসহ সার্বিক অর্থনীতিতে কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রম চলমান। এসব সংস্কারের সুফল ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। সংস্কার আরও গভীর ও কার্যকর হলে অর্থনীতি এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসবে—এমনটাই আশা করছে নীতিনির্ধারক মহল।


উপসংহার:
অর্থনীতির রক্তক্ষরণ থামানো গেছে, কিন্তু অর্থনীতিকে গতিশীল করার জন্য যে আস্থা, স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ দরকার—তা এখনো অনুপস্থিত। দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংক খাতের গভীর সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও সুদের হারের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা জরুরি। নচেৎ স্বস্তির এই অর্জন দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

ছবি: Staff Reporter