পুষ্টিগুণ, হজম ও স্বাস্থ্যঝুঁকি—কোন ক্ষেত্রে কোনটি ভালো
স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের খাদ্যতালিকায় বিটরুট এখন বেশ পরিচিত একটি নাম। তরকারি, সালাদ, জুস কিংবা গুঁড়া—নানা উপায়েই এই লাল রঙের সবজিটি খাওয়া হচ্ছে। রক্তস্বল্পতা দূর করা থেকে শুরু করে ত্বক উজ্জ্বল রাখা, এমনকি শরীর ডিটক্স করার ক্ষেত্রেও বিটরুটের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। তবে প্রায়ই একটি প্রশ্ন উঠে আসে—বিটরুট কাঁচা খাওয়া বেশি উপকারী, নাকি রান্না করে খাওয়াই ভালো?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিটরুট কাঁচা ও রান্না—দুটোই উপকারী। তবে উপকারিতার ধরন এক নয়। আবার সবার শরীরের চাহিদাও একরকম নয়। তাই বিটরুট খাওয়ার আগে জানা দরকার—কোন অবস্থায় কোনটি খাওয়া উচিত।
বিটরুট কেন এত উপকারী?
বিটরুটে রয়েছে—
- ভিটামিন সি
- আয়রন
- পটাশিয়াম
- ফোলেট
- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
- প্রাকৃতিক নাইট্রেট
এই উপাদানগুলো একসঙ্গে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, রক্ত সঞ্চালন উন্নত করতে এবং কোষের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। তবে এই পুষ্টিগুণ কতটা শরীরে পৌঁছাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে বিটরুট কীভাবে খাওয়া হচ্ছে তার ওপর।
কাঁচা বিটরুট খাওয়ার উপকারিতা
অনেকেই বিটরুট কাঁচা সালাদ বা জুস হিসেবে খেতে পছন্দ করেন। কারণ কাঁচা অবস্থায় বিটরুটের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি অক্ষত থাকে।
১. ভিটামিন সি বেশি থাকে
বিটরুট কাঁচা থাকলে এতে থাকা ভিটামিন সি পুরোপুরি বজায় থাকে। ভিটামিন সি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং শরীরকে বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
২. নাইট্রেট ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট অক্ষত থাকে
কাঁচা বিটরুটে প্রাকৃতিক নাইট্রেট ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ বেশি কার্যকর থাকে। এগুলো রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক এবং হৃদ্যন্ত্রের জন্য উপকারী।
৩. ত্বক উজ্জ্বল রাখতে সহায়ক
কাঁচা বিটরুট শরীরের ভেতর থেকে ডিটক্স করতে সাহায্য করে। ফলে ত্বক পরিষ্কার ও উজ্জ্বল রাখতে এটি বেশ কার্যকর।
৪. দ্রুত পুষ্টি শরীরে পৌঁছায়
সালাদ বা জুস হিসেবে খেলে বিটরুটের পুষ্টি দ্রুত শরীরে শোষিত হয়। যারা দ্রুত শক্তি বা তাৎক্ষণিক উপকার চান, তাদের জন্য এটি উপযোগী।
⚠️ তবে সতর্কতা জরুরি
সবাই কাঁচা বিটরুট সহজে হজম করতে পারেন না। অনেকের ক্ষেত্রে—
- গ্যাস
- পেটব্যথা
- হজমের সমস্যা
দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাদের পেট সংবেদনশীল, তাদের জন্য কাঁচা বিটরুট সমস্যা তৈরি করতে পারে।
রান্না করা বিটরুটের উপকারিতা
বিটরুট রান্না করলে কিছু পুষ্টি কমতে পারে, তবে এর কিছু আলাদা সুবিধাও রয়েছে।
১. হজমে সহজ
রান্না করা বিটরুট অনেক বেশি হজমযোগ্য। শিশু, বয়স্ক এবং যাদের হজমের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এটি নিরাপদ ও আরামদায়ক।
২. আঁশ ভালোভাবে কাজ করে
রান্নার পর বিটরুটের ফাইবার শরীরে ভালোভাবে কাজ করে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।
৩. আয়রন ও পটাশিয়াম বজায় থাকে
রান্না করলেও বিটরুটের আয়রন ও পটাশিয়ামের বড় অংশ থেকেই যায়। তাই রক্তস্বল্পতা বা দুর্বলতার ক্ষেত্রে রান্না করা বিটরুটও উপকারী।
৪. নিয়মিত খাওয়ার জন্য নিরাপদ
প্রতিদিন বা দীর্ঘ সময় ধরে বিটরুট খেতে চাইলে রান্না করা বিটরুট শরীরের ওপর তুলনামূলক কম চাপ ফেলে।
⚠️ একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি
বিটরুট বেশি সময় সিদ্ধ করলে বা বেশি তাপে রান্না করলে ভিটামিন সি কিছুটা নষ্ট হয়ে যায়। তাই হালকা সিদ্ধ বা অল্প রান্নাই ভালো।
তাহলে কোনটি বেশি উপকারী?
এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া কঠিন। কারণ এটি নির্ভর করে ব্যক্তির শরীরের অবস্থার ওপর।
- হজম শক্তি ভালো হলে এবং দ্রুত উপকার পেতে চাইলে কাঁচা বিটরুট খাওয়া যেতে পারে।
- পেট সংবেদনশীল হলে, গ্যাস বা হজমের সমস্যা থাকলে রান্না করা বিটরুটই বেশি উপযোগী।
- নিয়মিত খাদ্যতালিকায় বিটরুট রাখতে চাইলে রান্না করা বিটরুট নিরাপদ বিকল্প।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সপ্তাহে কয়েকদিন কাঁচা এবং কয়েকদিন রান্না করা বিটরুট খেলে দুই ধরনের উপকারই পাওয়া যায়।
অতিরিক্ত বিটরুট খাওয়া কি ভালো?
স্বাস্থ্যকর হলেও বিটরুট অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়। কারণ—
- অতিরিক্ত নাইট্রেট শরীরে সমস্যা করতে পারে
- কিডনিতে পাথরের ঝুঁকি বাড়তে পারে
- ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করা প্রভাবিত হতে পারে
তাই শরীরের চাহিদা বুঝে, পরিমিত পরিমাণে বিটরুট খাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
উপসংহার
বিটরুট নিঃসন্দেহে একটি পুষ্টিকর সবজি। কাঁচা ও রান্না—দুইভাবেই এর উপকারিতা রয়েছে। তবে কোনটি খাবেন, তা নির্ভর করবে আপনার হজম ক্ষমতা, স্বাস্থ্যের অবস্থা এবং নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের ওপর।
শুধু জনপ্রিয়তার কারণে বা অতিরিক্ত উপকারের আশায় অযথা বেশি বিটরুট খাওয়া ঠিক নয়। সঠিক পরিমাণ, সঠিক পদ্ধতি এবং নিজের শরীরের সংকেত বুঝেই বিটরুট খাওয়াই সবচেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত সিদ্ধান্ত।
স্বাস্থ্য ডেস্ক