নিউজ ডেস্ক: দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ মহানগর খুলনায় হঠাৎ করেই বায়ুদূষণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। নিয়ন্ত্রণহীন নগর উন্নয়ন, খোঁড়াখুঁড়ি, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ এবং শিল্প ও যানবাহনের ধোঁয়ায় শহরের বাতাস ক্রমেই মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। নগরজুড়ে ধুলোবালির আধিক্যে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগের ঝুঁকি।
খুলনা নগরীর প্রধান সড়ক ও ব্যস্ত এলাকাগুলোতে প্রতিদিনই চলছে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। কোথাও ড্রেনেজ সংস্কার, কোথাও সড়ক উন্নয়ন, আবার কোথাও ভবন নির্মাণ—কিন্তু এসব কাজের ক্ষেত্রে পরিবেশগত কোনো নিয়ম মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। খোঁড়াখুঁড়ির ফলে উড়ছে বিপুল পরিমাণ ধুলোবালি, যা বাতাসকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সড়কের পাশে খোলা ময়লা-আবর্জনা, অবৈধ ইটভাটা এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া। সব মিলিয়ে খুলনার বাতাস দিন দিন বিষাক্ত হয়ে উঠছে।
বায়ুমান সূচকে উদ্বেগজনক অবস্থান
বায়ুদূষণ নিয়ে কাজ করা সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার-এর তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় মাস ধরেই খুলনার বায়ুমান ‘অস্বাস্থ্যকর’ থেকে ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে অবস্থান করছে। সংস্থাটির হিসাব বলছে, ১২ নভেম্বর খুলনার বায়ুমান সূচক (AQI) ছিল ৩০৯, ২৬ নভেম্বর ছিল ২৭৭ এবং ১৯ ডিসেম্বর তা দাঁড়ায় ২৭৯-এ। বর্তমানে খুলনার বায়ুমান ২৭৭ থেকে ৩০৯-এর মধ্যে ওঠানামা করছে, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাত্রার বায়ুদূষণ ঢাকার তুলনায়ও বেশি, যা খুলনাবাসীর জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বার্তা বহন করছে।
ধুলো আর ধোঁয়ায় নাভিশ্বাস
সরেজমিনে দেখা যায়, সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল, আউটার বাইপাস সংযোগ সড়ক, গল্লামারী মোড়, রূপসা ব্রিজসংলগ্ন শিপইয়ার্ড সড়ক এবং জিরোপয়েন্ট এলাকায় ধুলোবালি ও ধোঁয়ার ঘনত্ব এত বেশি যে মাস্ক পরেও চলাচল করা কষ্টকর হয়ে পড়ছে। অনেক এলাকায় দিনের বেলাতেও বাতাসে ধুলোর আস্তরণ চোখে পড়ে।
সড়কের পাশেই খোলা অবস্থায় রাখা ইট, বালু ও সিমেন্ট ধুলোর মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভারী যানবাহন চলাচলের সময় এসব ধুলো উড়ে আশপাশের পরিবেশকে আরও দূষিত করে তুলছে।
নাগরিক সমাজের উদ্বেগ
সচেতন নাগরিকদের সংগঠন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, নগরীতে নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণ এবং সড়কের পাশে নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। তিনি জানান, অনেক সড়কে ধুলোর পরিমাণ এত বেশি যে মাঝে মাঝে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়াই কষ্টকর হয়ে পড়ে।
তার মতে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় নির্মাণকাজগুলো পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে।
‘স্বাস্থ্যকর শহর’ থেকে উল্টো পথে
জানা গেছে, ২০২০ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বের পাঁচটি শহরকে ‘স্বাস্থ্যকর শহর’ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ শুরু করে। সেই তালিকায় ছিল খুলনা শহরের নামও। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, খুলনা সেই লক্ষ্য থেকে অনেকটাই সরে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং কার্যকর তদারকির ঘাটতির কারণেই খুলনা শহর আজ দূষিত বাতাসের নগরীতে পরিণত হচ্ছে। তিনি বলেন, পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের অভাবে পরিবেশ সুরক্ষার উদ্যোগগুলো ফলপ্রসূ হচ্ছে না।
স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
বায়ুদূষণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু, বৃদ্ধ ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীদের ওপর। খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. মো. রুহুল আমিন বলেন, বাতাসে বস্তুকণার পরিমাণ বেড়ে গেলে মানুষের কাশি, শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমার মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসজনিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাস করলে হৃদরোগ ও ফুসফুসজনিত জটিলতার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
পরিবেশবাদীদের মতে, খুলনায় বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। সড়ক ও জনপথ, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকায় নির্মাণকাজগুলো পরিবেশবান্ধব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর, খুলনার উপ-পরিচালক সরদার শরীফুল ইসলাম জানান, দূষণ প্রতিরোধে খুলনায় প্রথমবারের মতো নির্মাণকাজ তদারকিতে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পরিবেশ বিধিমালা অনুযায়ী নির্মাণকাজ হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে নজরদারির আওতায় আনা হবে।
তার মতে, সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে খুলনাকে আবারও একটি স্বাস্থ্যকর শহর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
খুলনার বর্তমান বায়ুদূষণের চিত্র নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। নগর উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত নির্মাণ, নিয়ন্ত্রণহীন খোঁড়াখুঁড়ি এবং পরিবেশগত নিয়মের অবহেলা নগরবাসীর স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তখনই খুলনা আবার ফিরে পেতে পারে একটি স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য শহরের পরিচয়।