একসময়ের উচ্ছিষ্ট এখন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন সম্ভাবনা
মাছের শহর হিসেবে পরিচিত খুলনায় গড়ে উঠেছে নীরব অথচ সম্ভাবনাময় এক নতুন পেশা। যে মাছের আঁশ একসময় ছিল অবহেলিত উচ্ছিষ্ট, ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হতো নির্বিকারভাবে—সেই আঁশই এখন রপ্তানি পণ্য। আর এই আঁশ থেকেই বছরে আয় হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। গত চার-পাঁচ বছরে খুলনার মাছের বাজারগুলোতে তৈরি হয়েছে নতুন এক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র, যা বদলে দিয়েছে অর্ধশতাধিক পরিবারের জীবনমান।
খুলনার ময়লাপোতা সান্ধ্য বাজার, নতুন বাজার, বড় বাজার, মক্কি মসজিদের পাশের এলাকা, শান্তিধাম মোড়, খালিশপুর বাজার ও কেশবচন্দ্র কলেজ মোড়—এই সব জায়গায় কাঁচা মাছের আঁশ ছাড়ানোর কাজে যুক্ত হয়েছেন অন্তত ৫০ জনের বেশি নারী ও পুরুষ। আগে যারা অনিয়মিত কাজ বা বেকারত্বের সঙ্গে লড়াই করছিলেন, এখন তারা এই পেশার মাধ্যমে নিয়মিত আয় করছেন। তাঁদের অনেকের সন্তান এখন স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করছে, পরিবারে এসেছে স্বচ্ছলতা।
উচ্ছিষ্ট থেকে সম্পদে রূপান্তর
মাছ কাটার পর আঁশ সাধারণত ফেলে দেওয়া হতো। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি নষ্ট হতো একটি মূল্যবান জৈব উপাদান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি বাজারে মাছের আঁশের চাহিদা বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে চীনসহ কয়েকটি দেশে চিকিৎসা, প্রসাধনী ও শিল্পখাতে মাছের আঁশ ব্যবহারের কারণে এর কদর বেড়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) খুলনা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে খুলনা অঞ্চল থেকে চীনে মাছের আঁশ রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার ১৭৯ মার্কিন ডলার মূল্যের। এই সময়ের মধ্যে রপ্তানির জন্য সাতটি প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট অর্জন করা হয়েছে, যা এই খাতের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।
সরকারি হিসাব ও রপ্তানির পরিসংখ্যান
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ বদরুজ্জামান জানান, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে খুলনা থেকে মোট পাঁচ লাখ ৩৩ হাজার ৩৪০ কেজি মাছের আঁশ বিদেশে রপ্তানি হয়েছে। এর বাজারমূল্য প্রায় তিন কোটি ৪১ লাখ ৫২০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, “মাছের আঁশ এখন আর ফেলনা নয়। এটি একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্য। তবে আঁশ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মানা জরুরি।”
তিনি আরও জানান, এই পেশার সঙ্গে যুক্তরা সাধারণত কাঁচা আঁশ সংগ্রহ করে রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করেন। পরে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে তা বিক্রি করা হয়।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা: শ্রমে বদলাচ্ছে জীবন
নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ রুস্তম আলী প্রায় দুই-তিন বছর ধরে মাছের আঁশ সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, “আগে মাছ কাটার পর আঁশ ফেলে দিতাম। তখন বুঝিনি এর কোনো দাম আছে। এখন আমরা আঁশ রেখে দিই, ভালোভাবে রোদে শুকাই। পরে চট্টগ্রাম থেকে আসা ব্যবসায়ী বা তাদের প্রতিনিধিরা কিনে নিয়ে যান।”
তিনি জানান, বর্তমানে প্রতি কেজি শুকনো মাছের আঁশ ৫৫ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যদিও দুই বছর আগে এই দাম ছিল ১০০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত। তারপরও এটি তাদের জন্য বাড়তি আয়ের একটি ভালো উৎস।
নতুন বাজার লঞ্চঘাট এলাকার ২০ বছর বয়সী মুন্না মাছের আঁশ ছাড়ানোর কাজ করেন। তাঁর বাড়ির ছাদে রোদে শুকাতে দেওয়া আঁশ দূর থেকে দেখলে সোনালি ঝিলিক দেয়। তিনি বলেন, “প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাত কেজির মতো আঁশ জমে। এগুলো শুকিয়ে সংরক্ষণ করি। ১০–১১ মাসে প্রায় ১০–১২ মণ হলে ব্যাপারীরা এসে প্রতিমণ ১২০০ টাকা দরে কিনে নেয়। এতে মাসে কিছু বাড়তি আয় হয়, যা সংসারে কাজে লাগে।”
সংরক্ষণে সচেতনতা জরুরি
পল্লীমঙ্গল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠের পাশে মাছের আঁশ রোদে নাড়াচাড়া করছিলেন সোহাগ। তাঁর বাড়ি বিদ্যালয়ের পাশেই। সোহাগ বলেন, “ভেজা আঁশ রেখে দিলে পোকা ধরে। তাই এগুলো ভালোভাবে শুকানো জরুরি। কেউ কেউ শুকনো আঁশ কিনে গাছের গোড়ায় সার হিসেবেও ব্যবহার করেন।”
এ থেকেই বোঝা যায়, আঁশ সংরক্ষণে সামান্য অবহেলা হলে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে এর মান বজায় রাখা সম্ভব।
বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব ও সম্ভাবনার কথা
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. শিকদার সাইফুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে মাছের আঁশ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষত সারানো, হাড় জোড়া লাগানো, কোষের কাঠামো পুনর্গঠন, চোখের কর্নিয়ার পুনর্জন্ম, বিদ্যুৎচালিত রাসায়নিক বিক্রিয়া, প্রসাধনী প্রস্তুত এবং দূষিত পানি শোধন।”
তিনি আরও বলেন, মাছের আঁশে প্রচুর প্রোটিন, মিনারেল ও জৈব উপাদান রয়েছে। এজন্য চিকিৎসাবিজ্ঞান, মাছ ও পোলট্রি খাদ্যশিল্পে এর ব্যবহার বাড়ছে। অথচ বাংলাদেশে এখনো প্রায় ৯০ শতাংশ মাছের আঁশ অপচয় হয়ে যাচ্ছে।
ড. শিকদার সাইফুল ইসলাম মনে করেন, মাছের আঁশ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ ও রপ্তানির সঠিক ব্যবস্থা গড়ে তুললে বিপুলসংখ্যক মানুষকে স্বাবলম্বী করা সম্ভব। এজন্য মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি।
দেশীয় শিল্প গড়ে তোলার আহ্বান
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে উদ্যোক্তারা যদি মাছের আঁশ প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলতে পারেন এবং এর কার্যকর উপাদানগুলো দেশে ব্যবহার করা যায়, তাহলে বিদেশ থেকে আমদানির প্রয়োজন কমবে। বরং দেশীয় শিল্প বিকশিত হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
উপসংহার
খুলনার মাছের আঁশ রপ্তানি আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি একটি উদীয়মান শিল্পের ইঙ্গিত। একসময়ের ফেলনা উচ্ছিষ্ট এখন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস, কর্মসংস্থানের নতুন দরজা এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের উদাহরণ। সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও নীতিগত সহায়তা পেলে মাছের আঁশভিত্তিক এই শিল্প ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে।