—গভর্নর মনসুর
বাংলাদেশকে ধাপে ধাপে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে নতুন দিকনির্দেশনার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক-এর গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেছেন, ক্যাশলেস বাংলাদেশ বাস্তবায়নের জন্য প্রত্যেক নাগরিকের হাতে স্বল্পমূল্যের স্মার্ট ফোন পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। প্রাথমিকভাবে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকার মধ্যে একটি স্মার্ট ফোন দেশের প্রতিটি মানুষের নাগালে আনতে পারলেই ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত ও কার্যকর হবে।
শনিবার (২০ ডিসেম্বর) চট্টগ্রাম নগরীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি। সভার মূল প্রতিপাদ্য ছিল—চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করণীয়।
কক্সবাজার হবে দেশের প্রথম ক্যাশলেস জেলা
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশের পর্যটন ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে কক্সবাজার-কে বাংলাদেশের প্রথম ক্যাশলেস জেলা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সেখানে দৈনন্দিন কেনাকাটা, পর্যটন ব্যয়, পরিবহন ভাড়া, হোটেল ও রেস্তোরাঁর লেনদেনসহ সব ধরনের আর্থিক কার্যক্রম ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারের মতো একটি পর্যটননির্ভর অঞ্চলে ক্যাশলেস লেনদেন চালু হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা আরও সহজে আর্থিক লেনদেন করতে পারবেন, যা পর্যটন শিল্পের বিকাশেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
স্মার্ট ফোন ছাড়া ক্যাশলেস অর্থনীতি অসম্ভব
গভর্নর বলেন, ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো প্রযুক্তি। আর এই প্রযুক্তির সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর মাধ্যম হচ্ছে স্মার্ট ফোন। বর্তমানে দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী এখনো স্মার্ট ফোনের বাইরে রয়েছে। এই বাস্তবতা বদলাতে না পারলে ক্যাশলেস বাংলাদেশ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একজন সাধারণ নাগরিক খুব সহজেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লেনদেন করতে পারবেন। এজন্য স্মার্ট ফোনকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যায়ে আনতে হবে।”
আমদানি-রপ্তানি সহজ করতে সব পোর্টে চালু হবে আরটিজিএস
আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম আরও সহজ ও গতিশীল করতে বাংলাদেশের সব সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরে দ্রুতই আরটিজিএস চালু করার ঘোষণা দেন গভর্নর।
তিনি বলেন, সার্বক্ষণিক লেনদেন ব্যবস্থা চালু হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সময় ও ব্যয়—দুটোই কমবে। এতে করে দেশের ব্যবসায়ীরা দ্রুত অর্থ লেনদেন করতে পারবেন এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও বাড়বে।
চট্টগ্রাম অঞ্চল অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর তার বক্তব্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শুধু একটি বন্দরনগরী নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র।
তার ভাষায়, “চট্টগ্রাম অঞ্চল সমুদ্র, পাহাড় ও সমতলের এক অনন্য সমন্বয়। এই অঞ্চলের সঙ্গে যদি আমরা সিঙ্গাপুর, দুবাই ও হংকংয়ের মতো বৈশ্বিক বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর সংযোগ বাড়াতে পারি, তাহলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হবে।”
উৎপাদনমুখী খাতে স্বল্পমূল্যের ঋণ নিশ্চিত করার তাগিদ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, উৎপাদনমুখী খাতে পর্যাপ্ত ও স্বল্পমূল্যের ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করাই বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কাজ।
তিনি জানান, শিল্প, কৃষি ও রপ্তানিমুখী খাতে সহজ শর্তে ঋণ পৌঁছে দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। এতে করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।
মতবিনিময় সভার বিস্তারিত
চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে এই মতবিনিময় সভাটি অনুষ্ঠিত হয় রেডিসন ব্লু-তে। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিসের নির্বাহী পরিচালক মো. মকবুল হোসেন।
সভায় গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-এর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূঁইয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মো. খসরু পারভেজ।
সভায় করণীয় বিষয়ক একটি কনসেপ্ট পেপার উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল আমিন। আর স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আশিকুর রহমান।
ডিজিটাল ভবিষ্যতের পথে বাংলাদেশ
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্মার্ট ফোনভিত্তিক ক্যাশলেস লেনদেন ব্যবস্থা চালু হলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে, কর আদায় সহজ হবে এবং কালো টাকার ব্যবহার কমবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার ঘটবে।
গভর্নরের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট মহলে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে ক্যাশলেস বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জন খুব একটা দূরের বিষয় নয়।
উপসংহার
বাংলাদেশকে আধুনিক, ডিজিটাল ও ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে নিয়ে যেতে হলে প্রযুক্তি, নীতিগত সহায়তা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের ঘোষণাগুলো সেই পথেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আগামী দিনে স্মার্ট ফোন সহজলভ্য করা, ডিজিটাল লেনদেন নিরাপদ করা এবং বন্দরভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থাকে আধুনিক করার মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন অর্থনৈতিক যুগে প্রবেশ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
ছবি: নিউজ ডেস্ক ফাইল