মোঃ শামিম শেখ, বটিয়াঘাটা প্রতিনিধি :
পৌষ মাসের শুরুতেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আকাশ, বাতাস ও জনপদ যেন এক গভীর নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। ঘন কুয়াশা আর উত্তরের হিমেল হাওয়ার দাপটে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার উপকূলঘেঁষা নিম্নাঞ্চলের মানুষ পড়েছে চরম দুর্ভোগে। প্রকৃতির এই রুক্ষ আচরণ বদলে দিয়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ছন্দ।
সুরখালী, গঙ্গারামপুর, জলমা, বালিয়াডাঙ্গা, ভান্ডারকোট, আমিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যা নামার আগেই চারপাশ ঢেকে যাচ্ছে ধূসর কুয়াশার চাদরে। নদী-খাল, ধানক্ষেত ও খোলা মাঠ চোখের আড়ালে মিলিয়ে যাচ্ছে। রাত যত গভীর হচ্ছে, ততই বাড়ছে শীতের তীব্রতা। ভোরের দিকে কুয়াশা এতটাই ঘন হয়ে ওঠে যে তা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতো ঝরতে দেখা যায়। অনেক দিনই সকাল ১১টার আগে সূর্যের দেখা মিলছে না; আর দেখা মিললেও তাতে নেই উষ্ণতার ছোঁয়া।
এই বিরূপ আবহাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জনজীবনে। কাতিয়ানাংলা, সুকদাড়া, গাওঘরা, বারআড়িয়া, সুন্দরমহল, রায়পুর, মাইলমারা ও বয়ারভাঙাসহ আশপাশের জনপদগুলো সন্ধ্যার পরপরই জনশূন্য হয়ে পড়ছে। সড়ক ও বাজারে নেমে আসছে অস্বাভাবিক নীরবতা। ঘন কুয়াশার কারণে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দুর্ঘটনা এড়াতে ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে যানবাহন, বাধ্য হয়ে জ্বালাতে হচ্ছে হেডলাইট—ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে বাড়ছে ভোগান্তি।
ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক ইমন শেখ বলেন,
“অতিরিক্ত শীত আর কনকনে বাতাসে সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হতে পারি না। কাজ না করলে সংসার চালানো খুব কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।”
শীতের এই কনকনে ঠান্ডা সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষদের। দিনমজুর, ভ্যানচালক, চা-দোকানি ও ফেরিওয়ালারা পড়েছেন চরম জীবিকা সংকটে। ঠান্ডার ভয়ে মানুষ ঘরবন্দি থাকায় তাদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অথচ কাজ বন্ধ রাখলে সংসার চালানো কঠিন—শীতের সঙ্গে প্রতিদিনই লড়াই করতে হচ্ছে তাদের।
সুকদাড়া এলাকার ফেরিওয়ালা শিব দাস বলেন,
“শীতের কারণে মালামাল নিয়ে গ্রামে বের হতে পারছি না। আয় না থাকায় সংসার চালানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে।”
শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে গরম কাপড়ের চাহিদা। শীতবস্ত্রের দোকানগুলোতে ভিড় বাড়লেও দাম বেশি হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য তা বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে পুরোনো শীতবস্ত্র দিয়েই দিন কাটাচ্ছেন।
এই প্রতিকূল আবহাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরাও। দীর্ঘস্থায়ী শীত ও ঘন কুয়াশায় বোরো মৌসুমের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে ঠান্ডাজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে, যা স্বাস্থ্যখাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
গরিয়ারডাঙ্গা এলাকার চায়ের দোকানদার জিহাদ শেখ বলেন,
“শীতের তীব্রতার কারণে সকালে দোকান খুলতে পারছি না। ফলে আয় রোজগার নেই বললেই চলে।”
সব মিলিয়ে, কুয়াশা আর কনকনে শীতে বটিয়াঘাটাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপদ এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত শীতবস্ত্র বিতরণ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি উদ্যোগ দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।