মুসলিম উম্মাহ হারাল এক নিবেদিতপ্রাণ খাদেম ও সুমধুর কণ্ঠের অধিকারী
মদিনার পবিত্র মসজিদে নববীর সম্মানিত মুয়াজ্জিন শেখ ফয়সাল নোমান ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার ইন্তেকালে বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহ গভীর শোক ও বেদনা প্রকাশ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে মসজিদে নববীতে আজান প্রদানের মাধ্যমে তিনি শুধু একটি দায়িত্ব পালন করেননি, বরং কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ে ঈমানি অনুভূতির এক অনন্য সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন।
সৌদি আরবের দুই পবিত্র মসজিদভিত্তিক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম ‘ইনসাইড দ্য হারামাইন’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টের মাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। ওই পোস্টে জানানো হয়, মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) ফজরের নামাজের পর মসজিদে নববীতেই তার জানাজা আদায় করা হয়। জানাজা শেষে তাকে মদিনার ঐতিহাসিক ও সম্মানিত কবরস্থান জান্নাতুল বাকি-তে দাফন করা হয়।
পবিত্র ভূমিতে শেষ বিদায়
মদিনায় ইন্তেকাল করা এবং জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে দাফন হওয়া ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এক বিরল সৌভাগ্য হিসেবে বিবেচিত। বহু সাহাবি, তাবেয়ি ও ইসলামের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব এই কবরস্থানে শায়িত আছেন। শেখ ফয়সাল নোমানের জানাজায় বিপুলসংখ্যক মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। মসজিদে নববীর পরিবেশ সেদিন হয়ে ওঠে শোকাবহ ও আবেগঘন।
অনেক মুসল্লির চোখে পানি দেখা যায়, কারণ তার কণ্ঠে দেওয়া আজান বছরের পর বছর ধরে তাদের ইবাদতের অংশ হয়ে উঠেছিল। যারা সরাসরি মসজিদে নববীতে নামাজ আদায় করেছেন, আবার যারা দূর দেশে বসে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে আজান শুনেছেন—সবার কাছেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় এক নাম।
মুয়াজ্জিন হিসেবে দীর্ঘ ও গৌরবময় পথচলা
শেখ ফয়সাল নোমান ১৪২২ হিজরি সনে (২০০১ খ্রিস্টাব্দে) মসজিদে নববীর মুয়াজ্জিন হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিযুক্ত হন। এরপর টানা ২৫ বছর—১৪৪৭ হিজরি পর্যন্ত—তিনি এই দায়িত্ব নিষ্ঠা, সম্মান ও গভীর ভক্তির সঙ্গে পালন করেন।
মসজিদে নববীর মতো পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ স্থানে মুয়াজ্জিন হওয়া শুধু একটি চাকরি নয়; এটি এক ধরনের আমানত। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত আজানের মাধ্যমে মুসলমানদের নামাজের দিকে আহ্বান জানানো একটি মহান ইবাদত। শেখ ফয়সাল নোমান সেই আমানত সাফল্যের সঙ্গেই বহন করে গেছেন।
বংশ পরম্পরায় আজানের সৌভাগ্য
শেখ ফয়সাল নোমানের জীবনের একটি অনন্য দিক হলো—তিনি বংশ পরম্পরায় মসজিদে নববীতে আজান দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। তার দাদা ছিলেন মসজিদে নববীর একজন মুয়াজ্জিন। পরবর্তীতে তার বাবা মাত্র ১৪ বছর বয়সে এই সম্মানিত দায়িত্বে নিযুক্ত হন।
এই পারিবারিক ঐতিহ্য শুধু একটি পেশাগত উত্তরাধিকার নয়; বরং এটি ছিল ঈমান, আমল ও খিদমতের ধারাবাহিকতা। ছোটবেলা থেকেই তিনি আজানের পরিবেশে বেড়ে ওঠেন এবং ধীরে ধীরে নিজেকে এই মহান দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করেন।
সুমধুর কণ্ঠ ও আত্মিক প্রভাব
শেখ ফয়সাল নোমানের আজানের কণ্ঠ ছিল সুমধুর, গভীর ও হৃদয়স্পর্শী। তার কণ্ঠে ছিল এমন এক প্রশান্তি, যা শুনলে মন আপনাআপনি নামাজের প্রস্তুতির দিকে ঝুঁকে পড়ত। অনেক মুসলমানই সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন—তার আজান শুনে চোখে পানি চলে আসত, মন শান্ত হয়ে যেত।
আজানের শব্দ কেবল একটি আহ্বান নয়; এটি ঈমান জাগ্রত করার এক মাধ্যম। শেখ ফয়সাল নোমানের কণ্ঠ সেই দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করেছিল। তার আজান বহু মানুষের জন্য নামাজে মনোযোগ ও আত্মিক প্রশান্তির উৎস হয়ে উঠেছিল।
মুসলিম উম্মাহর শোক ও প্রতিক্রিয়া
তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আলেম, ইমাম, ইসলামি চিন্তাবিদ এবং সাধারণ মুসলমানরা শোক প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ তার জন্য দোয়া করেন এবং তার খিদমতের কথা স্মরণ করেন।
অনেকেই লেখেন—তিনি ছিলেন নীরবে কাজ করে যাওয়া এক মহান খাদেম, যিনি কখনো প্রচারের আলো চাননি। তার পরিচয় ছিল শুধু একটিই—মসজিদে নববীর মুয়াজ্জিন।
আজানের খিদমত: একটি অনন্য ইবাদত
ইসলামে আজান দেওয়া অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। হাদিসে মুয়াজ্জিনদের জন্য বিশেষ ফজিলতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মসজিদে নববীর মুয়াজ্জিন হওয়া মানে সেই ফজিলতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করা।
শেখ ফয়সাল নোমান তার জীবনের দীর্ঘ সময় এই খিদমতের মাধ্যমেই অতিবাহিত করেছেন। তিনি প্রমাণ করে গেছেন—নিয়মিত, নীরব ও নিষ্ঠার সঙ্গে করা ইবাদতই মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে ওঠে।
শেষ কথা
শেখ ফয়সাল নোমানের ইন্তেকালে মুসলিম উম্মাহ এক নিবেদিতপ্রাণ খাদেমকে হারাল। তার কণ্ঠ হয়তো আর শোনা যাবে না, কিন্তু তার আজানের স্মৃতি, তার খিদমত এবং তার ঈমানি উত্তরাধিকার মুসলমানদের হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবে।
আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন, তার কবরকে প্রশস্ত করেন এবং তার খিদমতকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করেন—এই দোয়াই আজ বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের কণ্ঠে।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।