নতুন প্রধান বিচারপতি হচ্ছেন জুবায়ের রহমান চৌধুরী

দেশের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদে নতুন নেতৃত্ব আসছে। দেশের নতুন প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন জুবায়ের রহমান চৌধুরী। তিনি বর্তমান প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ-এর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন। আগামী ২৮ ডিসেম্বর তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন। সোমবার (২২ ডিসেম্বর) সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে।

সংবিধান অনুযায়ী ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়ায় আগামী ২৭ ডিসেম্বর অবসরে যাচ্ছেন দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। দীর্ঘ বিচারক জীবনের ইতি টেনে তিনি ইতোমধ্যে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। তার অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। এবার সেই ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বের পরই তিনি স্থায়ীভাবে দেশের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও নতুন নেতৃত্ব

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির নিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের মধ্য থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন। সেই ধারাবাহিকতায় এবার জুবায়ের রহমান চৌধুরীকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে।

আইন অঙ্গনে এই নিয়োগকে একটি স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত পরিবর্তন হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কারণ ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিচার বিভাগ পরিচালনায় দক্ষতা ও ভারসাম্যের পরিচয় দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।

বিদায়ী প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ

ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম। ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালনকালে বিচারিক স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে আইনজ্ঞরা মনে করেন।

তার মেয়াদকালে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রায় বিচার বিভাগের দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করেছে। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে সাংবিধানিক বয়সসীমা পূর্ণ হওয়ায় তিনি অবসরে যাচ্ছেন, যা বিচার বিভাগে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

জুবায়ের রহমান চৌধুরীর বিচারক জীবন

নতুন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর বিচারিক জীবন দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ। তিনি ১৯৮৫ সালে জজ কোর্টে আইনজীবী হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। এর দুই বছর পর, ১৯৮৭ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

আইন অঙ্গনে ধীরে ধীরে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার স্বাক্ষর রেখে তিনি ২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। দুই বছর সফলভাবে দায়িত্ব পালনের পর তার নিয়োগ স্থায়ী হয়। দীর্ঘ সময় ধরে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে তিনি আইনের নানা জটিল বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

আপিল বিভাগে পদোন্নতি

২০২৪ সালের ১২ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। আপিল বিভাগে যোগদানের পর থেকেই তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলায় অংশগ্রহণ করেন এবং বিচারিক সিদ্ধান্তে প্রজ্ঞা ও নিরপেক্ষতার পরিচয় দেন।

আইন অঙ্গনের মতে, আপিল বিভাগে তার উপস্থিতি বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য ও সুস্পষ্ট যুক্তি প্রদান করেছে, যা তাকে প্রধান বিচারপতির পদে আসীন হওয়ার জন্য উপযুক্ত করে তুলেছে।

শিক্ষাগত যোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা

জুবায়ের রহমান চৌধুরী শিক্ষাগত দিক থেকেও সমৃদ্ধ একটি পটভূমির অধিকারী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি (অনার্স) ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক আইনের ওপর আরও একটি মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

আন্তর্জাতিক আইনের ওপর তার এই উচ্চতর শিক্ষা তাকে বৈশ্বিক আইনচর্চা সম্পর্কে গভীর ধারণা দিয়েছে। আইন বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেশের বিচার ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

শপথ গ্রহণ ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা

আগামী ২৮ ডিসেম্বর নতুন প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন জুবায়ের রহমান চৌধুরী। শপথ গ্রহণের পর তিনি দেশের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও বিচারিক দায়িত্ব পালন করবেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মামলার জট কমানো, বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বৃদ্ধি এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হবে তার প্রধান চ্যালেঞ্জ।

আইন সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে, তার নেতৃত্বে বিচার বিভাগ আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনগণমুখী হবে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মামলাগুলোর নিষ্পত্তিতে নতুন দিকনির্দেশনা আসতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

বিচার বিভাগের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রা

নতুন প্রধান বিচারপতির নিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচার বিভাগে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকল। একদিকে অভিজ্ঞ একজন প্রধান বিচারপতির অবসর, অন্যদিকে দীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নতুন প্রধান বিচারপতির আগমন—এই পরিবর্তন বিচার বিভাগের স্বাভাবিক গতিপথেরই অংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগ তার সাংবিধানিক ভূমিকা আরও দৃঢ়ভাবে পালন করতে সক্ষম হবে।

উপসংহার

নতুন প্রধান বিচারপতি হিসেবে জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নিয়োগ বাংলাদেশের বিচার বিভাগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা। দীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয়ে তিনি দেশের বিচার ব্যবস্থাকে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর করবেন—এমনটাই প্রত্যাশা আইন অঙ্গনের।

একই সঙ্গে বিদায়ী প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের অবদান দেশের বিচার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সাংবিধানিক নিয়ম মেনে এই নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।